আন্তর্জাতিক

মালদ্বীপে রাজনৈতিক সংকট ও প্রেক্ষাপট: বিক্ষোভের মুখে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ

মালে: কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভের মুখে অবশেষে মঙ্গলবার পদত্যাগ করলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ । ভারত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটির ফৌজদারি আদালতের প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতার ঘিরে মূলত দানা বেঁধে ওঠে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের মূল পটভুমি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণেই প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এই বিচারককে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মালদ্বীপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে এনেছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে পাঁচটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হলো:

১) সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নতি স্বীকার করে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ পদত্যাগ করলেন। তিনি টেলিভিশনে তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। মালদ্বীপের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ওয়াহিদ হাসানের কাছে তিনি তার দায়িত্ব স্থানান্তর করেছেন।

টেলিভিশনে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় নাশিদ দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার সরে যাওয়াই ভাল। আমি জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চাই না। তাই আমি পদত্যাগ করছি।’

তার পদত্যাগের পর গঠিত প্রশাসনকে ‘মালদ্বীপের জাতীয় সরকার’ হিসেবে অভিহিত করা হবে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। জাতীয় সরকার ২০১৩ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত মালদ্বীপের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।

২) কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের নতুন মোড় নেয় মঙ্গলবার দিনের শুরুতে যখন মালদ্বীপের পুলিশ সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। তারা সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশটির সরকারি টেলিভিশন কেন্দ্র দখল করে নেয়।

দেশটির বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ প্রেসিডেন্ট নাশিদ সম্পূর্ণ অগনতান্ত্রিক ভাবে মালদ্বীপের ফৌজদারি আদালতের প্রধান বিচারপতি আবদেলাহ মোহাম্মদকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বিচারের সময় অবৈধভাবে বিরোধীদলীয় সমর্থকদের সুবিধা দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ আনে কর্তৃপক্ষ।

সেই থেকে আবদেলাহ মোহাম্মদকে সামরিক হেফাজতে আটক রয়েছেন। এদিকে, সরকারের এই আচরণে দেশটির সরকারবিরোধীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও বিচারপতিকে গ্রেফতারের নিন্দা জানায়। বিচারপতি আবদেলাহ মোহাম্মদকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট নাশিদের প্রতি মালদ্বীপের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট, মানবাধিকার সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং জাতিসংঘসহ সবাই আহ্বান জানায়।

৩) প্রেসিডেন্ট নাশিদ মালদ্বীপে ২০০৮ সালে দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত অবাধ এবং নিরপেক্ষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এর ফলে দেশটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। তবে মামুন আব্দুল গাইয়ুম নির্বাচনে পরাজিত হলেও মালদ্বীপের সর্বস্তরে তার এখনও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে  দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে তাই অনেকটা দেখা হয় দুই রাজনৈতিক নেতার ক্ষমতার লড়াই হিসেবে।

৪) বিক্ষোভকারীদের দমনের নির্দেশ অমান্য করে মঙ্গলবার কয়েক শ পুলিশ সদস্য রাজধানী মালেতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলে পরিস্থিতি নাশিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অবশেষে প্রেসিডেন্ট নাশিদ নিজেই রাস্তায় নেমে এসে বিদ্রোহী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন । তিনি তাদের অবিলম্বে বিক্ষোভ বন্ধ করার নির্দেশ দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন দখল করে জণগণকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সামিল হওয়ার আহ্বান জানাতে থাকে।

৫) মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরে এক হাজার ১৯২টি ক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত একটি অপরূপ রাষ্ট্র, সৌন্দর্যের লীলাভূমি। অভিজাত অবকাশ যাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা সংবলিত এই দেশটি ইদানীং বিশ্বের পর্যটনের আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট নাশিদ দেশটির পর্যটন খাতকে আরও উদার এবং আকর্ষণীয় করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

তবে বিশ্বের ধনীদের কাছে মালদ্বীপ এখন আকর্ষনীয় অবকাশকেন্দ্র হলেও পর্যটনের এই রমরমা অবস্থাকে ভালো চোখে দেখছে না দেশটির রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ। কিছুদিন আগেই রক্ষণশীলদের চাপে দেশটির সব স্পা সেন্টার বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: