মুক্তমত

ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর – এমাজ উদ্দীন আহমদ

 

২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্জন ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর পূর্তি হলো। এই আন্দোলনের নায়ক এবং মহানায়কদের সচেতন উদ্যোগ এবং সীমাহীন ত্যাগের কাহিনী জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। স্মরণ করে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারিকে। শ্রদ্ধাবনত হয় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তভেজা অর্জনের জন্য, তাদের পুণ্যস্মৃতি স্মরণে রেখে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে ২১ ফেব্রুয়ারি রূপান্তরিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ১৮৮ জাতি সমন্বয়ে সংগঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো [টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঊফঁপধঃরড়হধষ, ঝপরবহঃরভরপ ধহফ ঈঁষঃঁত্ধষ ঙত্মধহরুধঃরড়হ-টঘঊঝঈঙ] ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে বিশ্ব ইতিহাসের এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়ে রূপান্তরিত করেছে। ১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগো নগরীর ‘হে মার্কেটে’ কিছু সংখ্যক শ্রমজীবীর ৮ ঘণ্টা শ্রমসময়ের দাবি যেমন তাদের আত্মদানের মাধ্যমে বিশ্বময় স্বীকৃতি লাভ করেছে, বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করে বাংলা ভাষার দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
তাই ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে প্রতিপালিত হচ্ছে না, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি দেশেও পালিত হয়েছে। বিশ্বের সর্বত্র শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে শহীদ বরকত, সালাম, জব্বার, রফিকের নাম। উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। ভাষার দাবিতে প্রাণ উত্সর্গকারীদের কথা ও কাহিনী বিশ্বময় উচ্চারিত হয়ে আসছে শ্রদ্ধার সঙ্গে।
২১ ফেব্রুয়ারির গৌরবময় কাহিনী জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসের এক অচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে উঠেছে দেশ ও বিদেশের অসংখ্য মানুষের তীর্থক্ষেত্র। বাংলাদেশের সেই সূর্যসন্তানরা এখন বিশ্বমানবের প্রিয়ভাজন। তবে এক্ষেত্রে এ-ও উল্লেখযোগ্য যে, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হলেও এটি বাংলাদেশের একান্ত আপন অর্জন। এটি হলো বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্জন।
ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহন। শিল্পকর্ম ও সৃজনমূলক উদ্যোগের মাধ্যম। তাই ভাষার ওপর আঘাত এলে সমগ্র জাতি শঙ্কিত হয়ে ওঠে। হয় আতঙ্কিত। উদ্যোগ গ্রহণ করে তা প্রতিহত করতে। যুক্তি-বুদ্ধির সহায়তায় তা সম্ভব হলে ভালো, তা না হলে এগিয়ে যায় রক্তাক্ত পথে। এগিয়ে যায় আত্মদানের তীরঘেঁষে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশের জনগণ প্রথমে পরিতৃপ্ত বোধ করেছিল। যে পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী ও আমজনতার সক্রিয় রাজনৈতিক উদ্যোগের ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে এবং তাদের সচেতন রায়ের ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেল পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী শাসকদের অবিবেচনাপ্রসূত নীতি ও কর্মকাণ্ড পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থের অনুকূল নয়। দেখা গেল, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি যে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার জনগণ এত বেশি স্পর্শকাতর, সেই সব ক্ষেত্রেই আঘাত শুরু হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মেরুদণ্ড ভাঙার ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাশ্রয়ীরা মেতে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই ২১ ফেব্রুয়ারির তাত্পর্য অনুধাবনযোগ্য।
২১ ফেব্রুয়ারি প্রমাণ করেছে, পূর্ব বাংলার জনগণের জীবনব্যবস্থা স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র তাদের আচার-আচরণ। স্বতন্ত্র তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। স্বতন্ত্র তাদের জীবন-চিন্তা, জীবন-জিজ্ঞাসা, এমনকি অধ্যাত্ম সত্তাও। এই স্বাতন্ত্র্যকে সংরক্ষণ করতে জনগণ প্রাণ পর্যন্ত পণ করে সংগ্রামে লিপ্ত হতে প্রস্তুত। স্বাতন্ত্র্য রক্ষার এই সংকল্পই এই জনপদে জনজীবনের দু’কূল ছাপিয়ে সামাজিক উপত্যকায় যে নতুন চেতনার প্রাণবন্যা সৃষ্টি করে, তা-ই কালে হয়ে ওঠে এক নতুন জাতীয়তাবোধ। এই জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে অমর সৌধ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এর ফলেই পূর্ব বাংলার জনগণের হাতে আসে নতুন পতাকা, যদিও রক্তরঞ্জিত পথে। সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিকদের হাতে আসে নতুন পরিচয়, নতুন ঠিকানা, হাজারও ধারায় রক্ত ঝরিয়ে যদিও। এই পরিচয় বাংলাদেশের জনগণ নিজেরাই নির্দিষ্ট করেছেন নিজেদের জন্য। এজন্য তাদের রক্তাক্ত পথে চলতে হয়েছে। রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। থামেনি কিন্তু। দুর্দম গতিতে পথ চলেছেন। এখনও চলছেন। কিন্তু শুরু করেছেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে। ভাষা যে কোনো জাতির সৃজনশীল ধীশক্তির অপূর্ব সৃষ্টি। জাতীয় মেধার অনন্য লালনক্ষেত্র। জাতীয় মননের আকর্ষণীয় স্থাপত্য বটে। সব দেশে, প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এ রকমই হয়ে থাকে। অন্যদের থেকে আমাদের স্বাতন্ত্র্য একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট হয়েছে এবং তা হলো বাংলা ভাষা আমাদের কাছে শুধু সৃষ্টিশীল জাতীয় প্রত্যয়ের স্থাপত্যই নয়, জাতি হিসেবে সবাইকে জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর মোহনায় সম্মিলিত করা এবং জাতি-ধর্ম-বিশ্বাস নির্বিশেষে সবাইকে জাতীয়তার স্বর্ণসূত্রে আবদ্ধ করার মহান লক্ষ্যে বিশিষ্ট স্থপতিও বটে। অন্য কোনো জনপদে এমনটি ঘটেনি। আমাদের স্বাতন্ত্র্যের বৈশিষ্ট্য এইখানটায়। ২১ ফেব্রুয়ারির তাত্পর্যও তাই। ঐক্যসূত্রের স্বর্ণসূত্র হলো একুশে ফেব্রুয়ারি।
বাংলাদেশের বাইরেও বাংলা ভাষা প্রচলিত রয়েছে। আসাম এবং ত্রিপুরার বিরাট জনসমষ্টির, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, জনসমূহের মাতৃভাষা বাংলা। সাহিত্য সম্ভারেও তা প্রবৃদ্ধ। বহু খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকের অবদানে সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য। ২১ ফেব্রুয়ারির মতো মহান অধ্যায় কিন্তু রচিত হয় পূর্ব বাংলায়। ১৯৪৭ সালে বঙ্গ বিভাগের সময় সাহিত্যের মালমসলা দুই বঙ্গেই ছিল প্রায় একই রকম। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নির্মাণের জন্য প্রায় একই রকম চুন-সুরকি বিদ্যমান ছিল। পূর্ব বাংলার অফুরন্ত প্রাণশক্তির স্পর্শে ওই চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি হলো ২১ ফেব্রুয়ারির মতো অতুলনীয় রক্তরাঙা স্থাপত্য। তৈরি হলো শহীদ মিনার ঢাকায়; কলকাতায় নয়। এই স্থাপত্যই কালে দিকনির্দেশক হিসেবে, অনেকটা সৃজনশীল স্থপতি হিসেবে, এক নতুন দিশারী রূপে, জনগণের চেতনায় সৃষ্টি করে বাঁধভাঙা জোয়ারের। এই বন্যায় ভেসে যায় করাচি-ইসলামাবাদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সব সম্পর্ক। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন প্রাণবন্যার কোনো নমুনা দেখা যায়নি; বরং পশ্চিমবঙ্গের জনগণ নিজেদের স্বাতন্ত্র্যবোধ বিস্মৃত হয়ে, আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ পরিহার করে, ভারতীয় সংস্কৃতির বৃহত্তর আবর্তে আত্মনিবেদন করেই হয়েছে পরিতৃপ্ত। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা টিকে রয়েছে, কিন্তু হিন্দি ও ইংরেজির দাপটে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে। বাংলাদেশে কিন্তু বাংলা ভাষার উত্তরণ ঘটেছে রাজকীয় ভাষারূপে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষারূপে। পশ্চিমবঙ্গে ভাষা বাংলা হলেও সাংস্কৃতিক জীবন হয়েছে পুরোপুরি ভারতীয়। বাংলাদেশে ভাষা বাংলা, কিন্তু সৃষ্টি করেছে স্বতন্ত্র এক আবহ। সৃষ্টি করেছে স্বতন্ত্র এক জীবনবোধ। স্বতন্ত্র এক সংস্কৃতি। এটি পাকিস্তানি নয়। নয় ভারতীয়। এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশী সংস্কৃতি। বাংলাদেশের জনগণ এজন্য গর্বিত। জাতি হিসেবে গর্বিত মহান একুশের উত্তরাধিকার মাথায় নিয়ে।
আমাদের বিশ্বাস, জাতীয় জীবনের এই ক্রান্তিকালে আত্মশক্তির উজ্জ্বল আলোর পথে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের পথপ্রদর্শক। এই পথ বন্ধুর বটে, কিন্তু গৌরবের। এ পথ সমস্যাসঙ্কুল হলেও আত্মপ্রতিষ্ঠার। এ পথ রক্তাক্ত বটে, কিন্তু সত্যের। এ পথ একান্তভাবে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব পথ। এ পথে চলেই বাংলাদেশ পৌঁছতে পেরেছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। ২১ ফেব্রুয়ারি এই পথের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশক। ইউনেস্কো এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের এই অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কো এই স্বীকৃতি দান করে বাংলাদেশের ষোলো কোটি জনসমষ্টির কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে। কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি বাংলাভাষীর। এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব ভাষার সাম্যেরও সূচক। যেসব জনপদে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের দাবিতে জনগণ এখনও সংগ্রামরত, এই স্বীকৃতি তাদের দাবির প্রতিও স্বীকৃতি। সংগ্রামমুখর এই বিশ্বে এই ঘোষণা বিশ্ব ইতিহাসের আরেক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: