মুক্তমত

মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার কোথায়?’

সুলাইমান নিলয় ও সুজন মণ্ডল

ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া সালাম-বরকতের প্রেরণা উদ্দীপ্ত দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও। তাই একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের সারিতে ছিল তারাও। তবে সেই সঙ্গে ’৫২ এর সেই চেতনার আলোকে নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ দাবি করেছেন তারা।

মঙ্গলবার একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গারো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল। সকালে ফুল দেয় ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম ও বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ব্যানারে লেখা ছিল- ‘হে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, তোমায় শ্রদ্ধাঞ্জলি, মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছে কি আদিবাসী?’

বাংলাদেশে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ২০ লাখ মানুষের বাস বলে বেসরকারি বিভিন্ন হিসেবে বলা হয়। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়েও মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন ভাষার এই জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ ঘটে না। তাদের পড়াশোনা করতে হয় বাংলাতেই।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক ত্রিজিনাড চাকমা বলেন, “মাতৃভাষার জন্য সালাম-বরকত জীবন দিয়েছেন। আমরা তাদের আত্মদানে উদ্দীপ্ত। আমরা চাই, মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জন করতে।”

নিজ জীবনের ইতিহাস তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের øাতকোত্তর পর্বের এই শিক্ষার্থী বলেন, “অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়তে হয়েছে ভারতে শরণার্থী হয়ে। এরপর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে আমরা ফিরতে পেরেছি। কিন্তু আজো আমাদের সমস্যা সমাধান হয়নি।”

মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকায় বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী হয় না বলে মনে করেন ত্রিজিনাড।

“আমার এলাকা দিঘীনালা উপজেলার (খাগড়াছড়ি জেলা) সাধনছড়া গ্রামে আমি দেখেছি, অনেক শিশু কেবল মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকার কারণে ঝরে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

এ বিষয়ে মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অব দ্যা ওয়ার্ল্ড, বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সদস্য ও বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল হাজং  বলেন, “মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জন আমাদের দাবিগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।”

তিনি জানান, বেসরকারি কয়েকটি সংগঠন নিজ উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছে। তবে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

স্থানীয় উদ্যোগের সমস্যা তুলে ধরে সোহেল হাজং বলেন, “সিলেটে মনিপুরী ভাষা, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা ও রাখাইন ভাষা এবং রাজশাহীতে সাঁওতাল ভাষায় স্বল্প পরিসরে এ ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য ওই সব সংগঠনগুলোতে স্কুল বানাতে হয়েছে। আলাদা সিলেবাস বানিয়ে বই ছাপিয়ে পড়াতে হয়।”

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি আদায়ে কানাডাভিত্তিক মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইনসহ অন্যান্য আইন অনুযায়ী মাতৃভাষায় শিশুদেরকে পড়াশোনা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া কথা সরকারের। তবে এটা আইনে থাকলেও বাস্তবে নেই।

এ জন্য আদিবাসী ভাষাগুলোতে বই ছাপানো, উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগসহ অনেক কাজ করা দরকার। কিন্তু কোনটিরই যথাযথ উদ্যোগ নেই, বলেন তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, “আমাদের সর্বশেষ শিক্ষানীতিতে সবার জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আদিবাসীদের জন্য এখনো তার বাস্তবায়ন নেই।”

“২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার সময় ইউনেস্কো বলেছিল, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার ভাষার মধ্যে ৫ হাজারই বিলুপ্তির হুমকির মুখে। এর অধিকাংশই আদিবাসীদের ভাষা,” বলেন তিনি।

সঞ্জীব জানান, বাংলাদেশে ৪০টির মতো নৃগোষ্ঠীর ভাষা ছিল। তবে যথাযথ উদ্যোগের অভাবে কোচদের ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কুরুক ভাষা ও বর্মনদের ভাষা হয়ত দু-একজন কথা বলতে পারে। এই দুই ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

“ভাষা হারিয়ে গেলে এদের সাহিত্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়। এই বৈচিত্র্য হারানোর ফলে বাংলাদেশ, এমনকি বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,” বলেন তিনি।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জাতীয় পর্যায়ে একটি আদিবাসী একাডেমী প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। আপাতত নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর বিদ্যালয়গুলোতে স্ব-স্ব ভাষাভাষী শিক্ষক নিয়োগের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: