অর্থনীতি

ইউনূসের সুযোগ নেই, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট হবেন লরেন্স বা হিলারি

হিলারি ক্লিনটন (সামনে), তার মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে লরেন্স সামারস

হিলারি ক্লিনটন (সামনে), তার মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে লরেন্স সামারস

তাসলিমা জামান: নোবেলজয়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশ্ব ব্যাংকের (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) প্রেসিডেন্ট মনোনীত করার লক্ষে কাজ করতে ঢাকা সফররত ইউরোপিয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদলকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  কিন্তু বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের পক্ষে কাজ করা দূরের কথা, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে ইইউ বা এর সদস্য ইউরোপিয় রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের কোনো নাগরিকেরই প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট হবার সুযোগ নেই।১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিজেদের কোনো নাগরিককেই এ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে পায়নি ইউরোপিয়রা। প্রথম প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক; সবাই আমেরিকান। এ বছরের এপ্রিলে একজন আমেরিকান নাগরিকই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মনোনীত হবেন। এখন এ পদে সম্ভাব্য দুই আমেরিকানের নাম জানা গেছে ওবামা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে।

আমেরিকার সিদ্ধান্ত ছাড়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রেসিডেন্ট নিয়োগ হয় না 

প্রত্যেকটি আন্তর্জাতিক ফোরামেরই নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য-কার্যবিধি উল্লেখযোগ্যভাবে স্বতন্ত্র। এদের কিছু কিছু নিয়ম দলিলে লিখিত আছে; যেমন ইউনাইটেড ন্যাশনস-এর (জাতিসংঘ)নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হতে পক্ষে ভোট লাগে ৯টি, কিম্বা আইএমএফ-এ (ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড)গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে ৮৫ ভাগ ভোটের দরকার। আবার অনেক নিয়মই আছে যার কোনো লেখাজোকা নেই; যেমন ইউনাইটেড ন্যাশনস-এর শীর্ষ পদটি কখনোই কোনো আমেরিকানের হবে না,আইএমএফ –এর প্রধানের পদেও কখনো কোনো আমেরিকানকে বসানো হবে না- এ পদটি সবসময়ই হবে কোনো ইউরোপিয় দেশের নাগরিকের এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধানের পদটি সবসময়ই থাকবে একজন আমেরিকানের কাছে। কেন?

কারণ,এ অলিখিত নিয়ম যাতে চালু থাকে- সেভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত ইউরোপিয় শক্তিগুলো ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সদ্য আবির্ভূত পরাশক্তি আমেরিকা ১৯৪৪ সালের জুলাইতে গঠন করেছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ওরফে আইবিআরডি (ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)।বিখ্যাত ব্রেটন উডস সম্মেলনে আইবিআরডি’র পাশাপাশি গঠন করা হয় আইএমএফ। আইবিআরডি সহ মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত হয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ; যাদের সংক্ষেপে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নামে ডাকা হয়।

বাংলাদেশের আর দশটা যৌথ মূলধনী কোম্পানির মতোই গঠন প্রক্রিয়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের। তবে কাজে পুরোপুরি আলাদা। মূলধনের সিংহভাগই নিয়ম অনুযায়ী আমেরিকা যোগান দেয়। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে আমেরিকার শেয়ার বেশি। কাজেই দেশটির তরফে মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাও এককভাবে সবচেয়ে বেশি।

ব্যাংকে আমেরিকান শেয়ার সবচেয়ে বেশি থাকায় বেশি সংখ্যক নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে দেশটির এবং নির্বাহী পরিচালকদের ভোটের ভিত্তিতে ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মনোনীত করা হয়। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে আমেরিকার ভোটাধিকারের পরিমাণ মোট ভোটের শতকরা ১৫.৮৫ ভাগ, যা এককভাবে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ঝুলিতে থাকা সর্বোচ্চ ভোট।  একমাত্র আমেরিকার এ পরিমাণ ভোটই পারে যে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মনোনয়ন বন্ধ করে দিতে।

যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ রক্ষার কোনো উপায় নেই 

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে বছর তিনেক আগে নতুন একটি দিক আলোচনায় উঠে এসেছিল; যা প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের সপক্ষে আশা দেখাতে পারতো।অ-আমেরিকান দুজন প্রার্থীর নাম কিছুটা আলোচনায় এসেছিল ২০০৯ সালে। সেবার দেশটির অনেক প্রভাবশালী নীতি বিশ্লেষকরা প্রস্তাব করেছিলেন, আমেরিকার উচিত নিজেদের নাগরিকদের বাইরে গিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের যোগ্য ব্যক্তিদের এ পদে নিয়ে আসা।সে বছর অনেকে ব্রাজিলের লুলা ডি সিলভা এবং ইনডিয়ার মনমোহন সিংয়ের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সে প্রস্তাব হালে পানি পায় নি ওয়াশিংটনে।

আর এবার এ পর্যন্ত কোনো প্রভাবশালী আমেরিকান বিশ্লেষকই লুলা বা মনমোহনের মতো করে ড. ইউনূসের ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব আনেন নি। আর আসলেও তা হালে পানি পাবে না। যেমনটি পাননি আইএমএফে’র সর্বশেষ প্রধান নির্বাচনের সময় একজন প্রভাবশালী অ-ইউরোপিয় প্রার্থী। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে ইউরোপ-আমেরিকার বোঝাপড়া অনুযায়ী আইএমএফ প্রধানের পদটি সবসময়ই একটি ইউরোপিয় দেশের প্রতিনিধিকে দেয়া হয়। ফলে গত বছরে মেক্সিকোর অগাস্তে কার্তেনস অনেক উন্নয়নশীল দেশের সমর্থন পেয়েও আইএমএফ প্রধান হতে পারেনি, হয়েছেন ফ্রান্সের ক্রিস্টিনা লেগার্ডে।

কারণ, বিশ্বব্যাংক আর দশটা বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো ‘ব্যাংক’ নয় কিম্বা আইএমএফ আর দশটা আর্থিক তহবিলে মতো ‘তহবিল’ নয়। নামে ‘ব্যাংক’ ও ‘তহবিল’ হলেও কাজের দিক থেকে এ প্রতিষ্ঠান দুটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক পুঁজি (অর্থনীতি) ও উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান দুই তদারককারী। মুরুব্বি প্রতিষ্ঠান।  যার মধ্যে প্রথমটি আবার অনেকটাই সামরিক বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দেখা গেছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে সবসময়ই আমেরিকার সাবেক শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের বা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেয়া হয়। এবারও তার ব্যাতিক্রম হবার কোনো উপায় নেই।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রেসিডেন্ট হবার দৌড়ে যারা আছেন

 ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদটি কার্যত তিনিই পাবেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যাকে এ পদটি দেবেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রথমবার বেছে নিয়েছিলেন সাবেক উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পল উলফোভিৎস’কে,পরে তাকে সরিয়ে পদটি দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাশের নির্বাহী রবার্ট জোয়েলিককে। অর্থমন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ বাছাইয়ের কাজটি একান্তই প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এখতিয়ারে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিকের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। এপ্রিলে বার্ষিক সভায় নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক,মনোনয়ন জমা দেবার শেষ তারিখ হচ্ছে ২৩ মার্চ। এ নিয়ে আমেরিকা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যস্ততা বর্তমানে খোদ দেশের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সম্ভাব্যদের মধ্যে দুজনের নাম আছে আলোচনার শীর্ষে। এরা হলেন দেশটির পররাষ্টমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও সাবেক অর্থমন্ত্রী লরেন্স সামারস। বর্তমান অর্থমন্ত্রী টিমোথি ফ্রাঞ্জ গেইটনর ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের প্রধান জিন স্পারলিং জোর সমর্থন দিচ্ছেন লরেন্সকে। এর আগে বিল ক্লিনটনের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেট দলীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন লরেন্স সামার, সর্বশেষ ২০১০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের প্রধানও ছিলেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তাকেই সুপারিশ করা হচ্ছে বলে হোয়াইট হাউসের ভেতরের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানাচ্ছে আমেরিকান বিভিন্ন প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম। তবে জানা গেছে, কূটনৈতিক দক্ষতা ও সুবিধা আদায়ের কথা চিন্তা করে হিলারি ক্লিনটনকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রেসিডেন্ট পদে বিবেচনা করছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে কৌতূহল 

এদিকে ড. ইউনূসের সামনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রেসিডেন্ট হবার কোনো সুযোগ না থাকলেও, প্রধানমন্ত্রী কেন এ বিষয়ে ইইউ প্রতিনিধিদলকে অনুরোধ করলেন? এ প্রশ্নে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম হয়েছে দেশজুড়ে। আগে ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ এবং ক্ষুদ্রঋণ দরিদ্রদের আরো দরিদ্র করছে বললেও বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,‘শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘দারিদ্র্য দূরীকরণে অসাধারণ অবদান রেখেছেন’’।

বেশি বয়সের কারণ দেখিয়ে ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরকার সরিয়ে দিলেও বুধবার প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কার্যক্রম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রসারিত করার লক্ষে ড. ইউনূসের অভিজ্ঞতা মূল্যবান সম্পদ হিসেবে কাজে আসবে।’’

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১১ সালের ২ মার্চ বেশি বয়সের কারণ দেখিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় সরকার।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: