জাতীয়

ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর: স্মারক মুদ্রা নোটের কাব্যিক ভাষা

ডেস্ক রিপোর্ট ঢাকা : মহান ভাষা আন্দোলনের ৬ দশকপূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করছে। বাঙালির গৌরবের ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছরপূর্তির সঙ্গে মিল রেখে নোটটি ৬০ টাকা মূল্যমানের (ফেস ভ্যালু) করা হয়েছে।

সাত অঙ্কের নম্বরসংখ্যার স্মারক এ মুদ্রাটি বিনিময়যোগ্য নয়, বিষয়টি নোটের প্রথম অংশে লালকালিতে এভাবে লেখাও রয়েছে : ‘বিনিময়যোগ্য নয়’।

সামনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় বাংলায় লেখা রয়েছে ‘ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর’।

পেছনে একই বক্তব্য লেখা রয়েছে ইংরেজিতে : ‘60 Years of Language Movement 1952-2012’।

নোটের সিরিয়াল নম্বরের ‍আগে রয়েছে ‘স’ ও ‘ন’ বর্ণ দু’টি। এর প্রথমটি ‘স্মারক’ ও দ্বিতীয়টি ‘নম্বর’ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। নোটটির মুদ্রণকারী দেশি প্রতিষ্ঠান সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন(বাংলাদেশ) লিমিটেড।

চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে বাজারে ছাড়া এ স্মারক মুদ্রার নকশা এঁকেছে সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের নকশাবিদরা। তবে স্মারক এই কাগুজে মুদ্রাটির জন্য সুদৃশ্য ফোল্ডার ও এনভেলপ ডিজাইন করেছেন এসএম আতিকুর রহমান এবং এইচএম মল্লিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের স্বাক্ষর করা ১৩০*৬০ মিলিমিটার আকারের নোটটির জমিনের রং হলুদ, শৈল্পিক সৌকর্য ও রংয়ের পরিমিতিবোধের অসাধারণ সমন্বয়ের মাধ্যমে নোটটিতে গাছ-ফুলসহ অন্যান্য রংগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তবে মুদ্রাটির সবচেয়ে নান্দনিক আর মর্যাদার বিষয়টি হলো ‍এর সামনের ও পেছনের চিত্রগুলো। এর সামনের পিঠে বাঙালির আত্মপরিচয়ের নিদর্শনধারী উদীয়মান সূর্যের আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ছবি নোটটির শোভা বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে।

তবে নোটটি ওল্টালে এর অপর পিঠের বিষয়বস্তুও বাঙালি মাত্রেই যে কাউকে আবেগময় করে তুলবে। এখানে আছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউর-এর গৌরবদীপ্ত মুখশ্রীর আবক্ষ ছবি এবং এঁদের মাঝখানে আছে ১৯৫২ সালে নির্মিত বাঙালির ও বিশ্বের প্রথম ভাষা শহীদ মিনার। এর নিরাপত্তা সুতার স্থানে রয়েছে দৃশ্যমান এমবেডেড রূপালী ফয়েল সূতো।

মুদ্রাটিতে জলছাপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি।

স্মারক নোটের সুদৃশ্য ফোল্ডারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে লেখা রযেছে- ‘ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের জনগণের জন্য ভাগ্য নির্ধারণী ঘটনা’।

প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য নিহিত আছে এদেশের আপামর জনসাধারণের চিন্তা-চেতনার রূপান্তরে যাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য চেতনা জেগে উঠেছিল এমন এক সময় যখন তারা উদ্ভূত আগ্রাসন থেকে নিজস্ব ভাষাকে রক্ষার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরিমণ্ডলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা নাকচ করার ইঙ্গিত থেকেই তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের শুরু। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে মোহম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় দেয়া ভাষণে যখন বললেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল বাংলা ভাষা পাকিস্তানি রাজনীতির কাছে হুমকির সম্মুখীন।

এ উক্তি একটি আসন্ন বিপদেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল এবং তাদের এ চেষ্টাকে রুখে দাঁড়ানোর জন্য বাঙালি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে উঠলো। ১৯৫২র শুরুতে দেখা গেল প্রশাসন বাংলা ভাষার প্রাপ্য মর্যাদা অস্বীকারে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

একইভাবে মাতৃভাষাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে একটি দৃঢ়প্রতীজ্ঞ সংগ্রাম গড়ে তুলে বাঙালি ‍তার ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকে পুনর্জাগরিত করল। ১৯৫২র ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছত্রসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ তাদের দাবি আদায়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসলে রাষ্ট্র নৃশংসভাবে তাদের ওপর অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করে। জব্বার, রফিক, বরকত, সালামসহ আরো কয়েকজন তরুণ নিমিষেই পলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। এ দিনটি বাঙালির ভবিষ্যৎ দর্শনকে চিরতরে পাল্টে দেয়…উনিশ বছর পর এ পুনর্জাগরণই বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে এবং বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা চিরপ্রত্যাশিত মর্যাদা লাভ করে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মারক হিসেবে ধরে রাখতে স্মারক মুদ্রা প্রচলনের রেওয়াজ রযেছে। বিশেষ করে সংগ্রাহকরা এসব মুদ্রা সংগ্রহে রাখতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করেন। তবে অসাধারণ কাব্যিক নকশা আর সংগ্রামী একটি ভাষা-জাতির আত্মপরিচয়ের গৌরবময় উন্মেষের স্মৃতিকে ধারণ করা এ নোটটির মালিক হওয়া সেসব সংগ্রাহকের গৌরবকে একসময় হিমালয় চূড়ায় নিয়ে যাবে বলে আমরা মনে করি।

কারণ, দুনিয়ার আর কোনো দেশ চাইলেই এ ধরনের বিষয়বস্তুর ওপর আর একটি নোট প্রকাশের চিন্তাও করতে পারবে না। এ অহংকার আর গর্ব শুধুই বাঙালির- যা ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছরের ইতিহাসকে বিস্ময়কর কাব্যময়তায় উপস্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ স্মারক মুদ্রায়।

বলা হয়ে থাকে- ‘টাকার ‍কাছে দুনিয়া গোলাম!’ সাধারণ্যে প্রচলিত মোটাদাগের এই আপ্তবাক্যের সত্যাসত্য যাচাইয়ের তর্কে না গিয়েও বলা যায়- স্মারক নোটটি প্রমাণ করেছে- ‘অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার মূল শক্তি’ টাকা বা মুদ্রা দিয়েও প্রকাশ করা যায় একটি জাতির মহাকাব্যিক ইতিহাসকে।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: