জেলার খবর

রাজশাহীতেই নির্মিত হয়েছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার!

রাজশাহী: ভাষা শহীদদের স্মরণে রাজশাহীতেই দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি তৈরি হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় এখনো রাজশাহীতে যারা বেঁচে আছেন, তাদের একজন সাঈদ উদ্দিন আহমদ। তার দাবি, দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীতে সক্রিয় থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাঈদ উদ্দিন আহমদ। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন রাজশাহী কলেজের ছাত্র। পেশায় লেখক ও সাংবাদিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ এখন বয়সের ভারে ন্যূব্জ, রোগ-শোকে কাতর। তার সঙ্গে কথা হয় রাজশাহী মহানগরীর অলকার মোড়ের নিজ বাসায়।

ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ বলেন, সব আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রাজশাহী কলেজ। ‘ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা বরাবরই সক্রিয় ছিল। আমরা ভাষা আন্দোলনে ঢাকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে তাল রেখে রাজশাহীতে আন্দোলন-সংগ্রাম কর্মসূচি পালন করতাম। রাজশাহীর ছাত্র-জনতা ছিল আন্দোলনে অগ্রগামী।’

তিনি বলেন, ‘১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমরাও রাজশাহীতে ভাষার দাবিতে আন্দোলন করছি। ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে আমরা দিনভর ঢাকার খবর জানার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। কারণ, রাজশাহীর ছাত্রদের মনে গভীর আশঙ্কা ছিল ঢাকায় বড় কিছু ঘটতে পারে।’

অবশেষে সন্ধ্যার দিকে রাজশাহীতে খবর এলো- ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হয়েছেন। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী শহরে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তখন রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ কিছুই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে একটি মেডিক্যাল স্কুল ছিল।

ফলে ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়তে  যেতো। গুলির খবরে তাদের বাড়ির লোকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাধারণ মানুষের জটলা শুরু হলো এখানে সেখানে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে। সবাই জানতে উৎসুক, কী ঘটেছে ঢাকায়।’

ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ বলেন, এক পর্যায়ে কয়েক শ’ ছাত্র জমায়েত হলো রাজশাহী কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে। সবার চোখে-মুখে গভীর উৎকন্ঠা। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ে সবার কন্ঠেই উচ্চারিত হচ্ছিল- ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের সিনিয়র ছাত্র এস.এম গাফ্ফারের সভাপতিত্বে ছাত্রদের সভা হয়।

সভায় রাজশাহীতে দুর্বার গতিতে ভাষা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। শহীদ ছাত্রদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওই সভাতেই। ইট ও কাদামাটি দিয়ে যেভাবেই হোক, রাতেই শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার তৈরি করতে হবে বলে সবাই উদ্যোগ নিই।’

এদিকে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হন মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র এস.এম গাফ্ফার এবং যুগ্ম আহ্বায়ক রাজশাহী কলেজের সিনিয়র ছাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোলাম আরিফ টিপু (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর) ও নাটোরের হাবিবুর রহমান।

ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শহীদ মিনার নির্মাণ বা তার অবয়ব সম্পর্কে তখন আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। এই অবস্থায় সারারাত ধরে ইট ও কাদা-মাটি দিয়ে আমরা একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করলাম।

শহীদদের স্মরণে স্তম্ভের গায়ে আমি নিজেই লিখে দিলাম ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। আরও লিখে দেওয়া হলো কবিগুরুর বিখ্যাত কবিতার একটি চরণ- ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

তিনি বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি পুরনো ভাঙাচোরা ক্যামেরা দিয়ে সেই শহীদ মিনারের ছবি তোলা হয়, যা আজও সংরক্ষণ করা আছে। এদিকে আমরা সারা রাত জেগে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করি। পরদিন সকালে হরতালের পিকেটিং করার জন্য আমরা সবাই হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। এ সময় পুলিশ এসে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। আমরা খবর পেয়ে বিকেলে এসে দেখি, পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

অসুস্থ ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। তাই দাবি করছি, রাজশাহীতে নির্মিত প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আমি প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করেছি।

আশা করি, সরকার প্রধান ভাষা আন্দোলনের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা থেকেই রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেবেন।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: