জাতীয়

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ৩ বছর: শোকে, শ্রদ্ধায় স্মরণ

বিডিআর বিদ্রোহে প্রাণ হারানো সেনা কর্মকর্তারা চিরনিদ্রায় শায়িত বনানী কবরস্থানে। গতকাল পেরিয়ে গেল সেই ঘটনার তিন বছর। হারানো স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিকটজনেরা

বিডিআর বিদ্রোহে প্রাণ হারানো সেনা কর্মকর্তারা চিরনিদ্রায় শায়িত বনানী কবরস্থানে। গতকাল পেরিয়ে গেল সেই ঘটনার তিন বছর। হারানো স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিকটজনেরা

বিশেষ প্রতিনিধি: হলুদ গাঁদা ফুলে ভরে আছে কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমদের কবর। পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন স্ত্রী ফাতেমা সুলতানা। আর মাকে ধরে ভেজা চোখে দাঁড়িয়ে আছে ছোট মেয়ে লামিয়া। ফাতেমার হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। গুচ্ছবদ্ধ রজনীগন্ধাকে ঘিরে আছে অকালপ্রয়াত স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসা।
গতকাল শনিবার সকালে এভাবেই শোকে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ফুলে ফুলে ভরে গেল বনানীর সামরিক কবরস্থান।
তিন বছর আগে এই দিনে বাবার কোনো খোঁজ পায়নি লামিয়া ও তাসমিয়া। পরিবারের সবাই তখন উৎকণ্ঠায়। অনেক পরে মেলে বাবার মৃতদেহ। আগের বছরে আত্মীয়স্বজন অনেকেই এসেছিলেন এই কবরস্থানে। এবার শুধু মাকে নিয়ে লামিয়া এসেছে। ফাতেমা বললেন, বড় মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা। ও আসতে পারেনি।
পিলখানায় বিপথগামী জওয়ানদের বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনদের অনেকেই কাল এসেছিলেন বনানীর সামরিক কবরস্থানে। ছিল সামরিক আনুষ্ঠানিকতা, নানা কর্মসূচি। সকালে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি। সশস্ত্র বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত হন।
মেজর ইদ্রিস ইকবালের দুই শিশুসন্তান জারা আর নুসাইবাকে নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রী তাসলিমা। তিনি দাঁড়িয়ে কেবলই চোখের পানি ফেলছিলেন। কথা বলতে চাইলে বললেন, ‘যা হারিয়েছি তা তো আর ফিরে পাব না। কথা বলে কী করব।’
বিডিআর বিদ্রোহের আট মাস আগে মাকে হারায় রামি ও সামি দুই ভাই। আর নৃশংস বিডিআর হত্যাকাণ্ডে তারা বাবা মেজর মিজানুর রহমানকে হারায়। কাল দুই ভাইকে নিয়ে দাদি কোহিনুর বেগম এসেছিলেন কবরস্থানে। দাদি ছোট নাতির হাতে ধরে বলেন, ‘দাদু, এ মাটিতে হাত দাও, এখানে তোমার বাবা ঘুমিয়ে আছে।’
কবরের সামনে খোলা মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে সাড়ে তিন বছরের রূপন্তি। মাত্র পাঁচ মাস বয়সেই বাবা মেজর হুমায়ুন হায়দারকে হারায় সে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শিকার সেনা কর্মকর্তাদের বেশির ভাগেরই দাফন হয়েছে এই কবরস্থানে। কয়েকজনকে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। সারি সারি কবরগুলো সিরামিকের ছোট দেয়াল আর স্টিলের রেলিং দিয়ে ঘেরা। মাঝে কালো সিরামিকে লাগানো স্মৃতিস্তম্ভ। তাতে তিন সারিতে নিহত সব কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম লেখা। এই নামফলকের বেদিতেই সকাল থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বজনেরা।
সকাল ১০টার দিকে কবরস্থানে আসেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুসহ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা। নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতির পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কাজী ফকরুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সহকারী সামরিক সচিব লে. কর্নেল মনিরুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল জেড ইউ আহমেদ ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল শাহ মো. জিয়াউর রহমান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন।
আওয়ামী লীগের পক্ষে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ অন্যান্য নেতা শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত হন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদও।
ফুল দেওয়ার পর নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন উপস্থিত সবাই। নিহতদের স্মরণে দোয়া করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন সেনা মসজিদের ধর্মীয় শিক্ষক মাহমুদুল হক।
জোহরের নামাজের আগে সব সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে (গ্যারিসন/প্রধান মসজিদ) এরিয়ার তত্ত্বাবধানে এবং ঢাকা সেনানিবাসের সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে সদর দপ্তর লগ এরিয়ার তত্ত্বাবধানে কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় কোরআন খতম ও পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। মিলাদের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিডিআরের পলাতক আসামিরা দেশের বাইরেও চলে যেতে পারে। দেশের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই থাকুক, তাদের খুঁজে বের করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, মহানগর দায়রা জজ আদালতে বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন হত্যা মামলার বিচার চলছে। বিচার দ্রুত করতে এই সময় বাড়ানো হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালতের পক্ষ থেকে এ ধরনের পরামর্শ পেলে তা বিবেচনা করা হবে।
বিএনপি: দুপুরে বনানীর সামরিক কবরস্থানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে জ্যেষ্ঠ নেতারা দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলের পক্ষ থেকে নিহতদের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। ওই সময় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন তাঁরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান মাহাবুবুর রহমান, আ স ম হান্নান শাহ, রুহুল আলম চৌধুরী, ফজলে আকবরসহ অন্যান্য নেতা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: