মুক্তমত

যুদ্ধাপরাধের বিচার : সাক্ষ্য নিয়ে হতাশা

আনিস রায়হান

অনেক জল গড়িয়ে বাঙালির অনেক আকাক্সক্ষার যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে ৪০ বছর পর। কিন্তু সেই বিচার প্রক্রিয়ার পদে পদে এখন হতাশা। একটু উদ্যোগী হলেই যেসব সমস্যা থাকার কথা না সেই সমস্যাগুলোই এখন ভোগাচ্ছে আদালত ও প্রসিকিউশনকে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের নানা সীমাবদ্ধতার কথা শোনা যাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু যখন আসামিদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখনই শুরু হলো মূল সমস্যা। আসামিদের বিরুদ্ধে সময়মতো আদালতে সাক্ষী হাজির করা, আদালতে কথা বলা, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার মুখে ভড়কে না গিয়ে সাক্ষীদের সত্য কথা বলার মতো যোগ্যতা, সাক্ষীদের মৃত্যু, অসুস্থতা, সর্বোপরি সাক্ষীদের নিরাপত্তা, সাক্ষ্য বিষয়ক এমন অনেক বিষয় এখন এ বিচার প্রক্রিয়ার মূল সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এরই মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরা হচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি, বিএনপিদলীয় সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম, জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক আমির গোলাম আযম, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা। এদের মধ্যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারকাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। নেয়া হয়েছে বেশ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দি। কয়েকজন সাক্ষীকে জেরাও করা হয়েছে।
সাঈদীর মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের সময়েই সাক্ষীর সমস্যাটি প্রকটভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। সাক্ষী হাজির করতে বার বার ব্যর্থতা, আদালতে এসে ভড়কে গিয়ে সাক্ষীদের উল্টাপাল্টা তথ্য দেয়া এবং তথ্যের এসব গরমিলের কারণে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিনিয়তই সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা চালাতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের পড়তে হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ক্ষোভ ও তোপের মুখে। সাক্ষী নিয়ে সৃষ্ট এ সমস্যার এখনই কোনো সমাধানও বের করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলোতে সরকারের ঢিলেমি বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সাক্ষীদের অনুপস্থিতি-অপ্রস্তুতি
সাক্ষী হাজির করায় রাষ্ট্রপক্ষের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার ঘটনা ঘটে গত ২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন আদালতে তিনজন সাক্ষী হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা একজন সাক্ষীও হাজির করতে পারেননি। ওই দিন সকালে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয় তিন জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছে। কিন্তু তারা তাদের আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার কথা বলে চলে গেছেন। এরপর থেকে তাদেরকে আমরা পাচ্ছি না। ফলে পরবর্তী দিনে সাক্ষীর জবানবন্দির জন্য সময়ের আবেদন করছি। জবাবে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আমাদের আদেশে তো সাক্ষীদের তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আপনারা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, এ নিয়ে ১৫ জন সাক্ষীকে উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রসিকিউশন। তিনি এমন অভিযোগও তোলেন, সাক্ষীদের হাজির না করে আসলে তাদের মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে।
পরবর্তীতে আদালত ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিচারকার্য মুলতবি করেন। ৭ ফেব্রুয়ারি চারজন সাক্ষী উপস্থিত করার কথা থাকলেও মাত্র একজনকে হাজির করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। আদালত এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হাজির হওয়া একমাত্র সাক্ষী ওই দিন ট্রাইব্যুনালকে সাঈদীর ‘অপরাধ’ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সাক্ষী বলেন, ‘১৯৭০ সালে বাঘারপাড়া হাইস্কুল মাঠে একটি নির্বাচনী সভা হয়েছিল। ওই সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম না, তবে শুনেছি।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আর কী জানেন?’ সাক্ষী বলেন, ‘আমি আর কিছু জানি না। এলাকার রওশন সাহেবের বাড়িতে সাঈদী সাহেব আসা-যাওয়া করতেন। তবে যুদ্ধের আগে না পরে, মনে নেই।’ এ জবানবন্দিতে কোনো তথ্য না পাওয়ায় ওই  সাক্ষীকে কোনো জেরাও করেননি আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারার বিষয়টি খুব নেতিবাচকভাবে নেন বিচারকরা। ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সাক্ষী না দেখতে পেয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মি. চিফ প্রসিকিউটর ‘হোয়াট শ্যাল আই ডু?’ তখন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা অসহায়বোধ করছি। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, পাঁচ দিন বন্ধ দিলাম, তাও সাক্ষী আনতে পারেননি।
তখন গোলাম আরিফ আবার বলেন, কী বলব বুঝতে পারছি না। আমরা চেষ্টা অব্যাহত রাখছি। এটি একটি কঠিন কাজ। আদালতের নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষী হাজির করতে হলে নির্ধারিত সময়ে তাদের নাম আদালতে জমা দিতে হয়। আদালত তখন সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে (থাকা, খাওয়া) ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচাপরপতি নিজামুল হক রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও সাক্ষী আসেনি, তাহলে সাক্ষীদের ব্যাপারে ওই দরখাস্ত কেন করেছিলেন। তখন তিনি বলেন, ‘দ্য অর্ডার হ্যাজ বিন পাসড। উই ক্যান’ট থিঙ্ক হোয়াই ইট হ্যাজ নট বিন কমপ্লাইড।’
সাক্ষী উপস্থাপন না করতে পারায় একদিকে সঙ্কট হচ্ছে। অন্যদিকে সাক্ষীরা উপস্থিত হয়েও নানা বিপত্তি বাধাচ্ছেন। সাঈদীর মামলার প্রথম সাক্ষী মাহবুবুল আলম  নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় দিলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার চাপে তিনি একেবারেই ভড়কে যান।  জেরার সময় তিনি পিরোজপুর সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের প্রধান গোয়েন্দার নাম বলতে পারেননি।
চতুর্থ সাক্ষী সুলতান আহমদ হাওলাদার একজন গ্রামীণ কৃষক। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ আনেন, কলা চুরির মামলায় পিরোজপুর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জেল দেন সুলতান আহমদকে।
এ ধরনের অভিযোগ আনার পর আর আসামিপক্ষের প্রতাপশালী আইনজীবীদের আর কোনো প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। এমনকি আদালতে ভয়ে কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি। অথচ এই সাক্ষীকে কেউ এই বলে সাহস দেয়নি যে, তার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে এই মামলার তথ্য উপস্থাপনের কোনো সম্পর্ক নেই।
সাক্ষীদের হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষের এ ব্যর্থতার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘এটা আমি আদালতেও বলেছি, কাজটি অনেক কঠিন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সাক্ষীদের নিয়ে সৃষ্ট এ সঙ্কট সমাধান করতে হলে ট্রাইব্যুনালের লোকবল এবং রসদ আরো বাড়াতে হবে।’
সাক্ষীদের অপ্রস্তুত হয়ে পড়ার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘গ্রামের সহজ সরল মানুষ। এরকম হবেই। এটা আদালত বুঝতে পারেন। তাছাড়া এত দিন আগের ঘটনা। সবার কথা সবক্ষেত্রে মিলবে না এটাই স্বাভাবিক। আমাদের কোনো অধিকার নেই সাক্ষীদের কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে আনানোর। তারা যা জানে তাই বলবে।’

অসুস্থতা-মৃত্যুর থাবা
যুদ্ধাপরাধের বিচারে বিভিন্ন মামলায় যাদের সাক্ষী করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশের বয়সই ৬০ বা তদূর্ধ্ব। বার্ধক্যজনিত কারণে সাক্ষীদের বড় একটি অংশ অসুস্থ। কেউ কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি। সাক্ষীদের অসুস্থতা বিচারকার্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। গত ১৭ জানুয়ারি সাঈদীর মামলায় দুপুর বারোটায় আব্দুল হালিম বাবুল নামে একজন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং জেরা শেষে নতুন সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার কথা ছিল মধুসূদন ঘরামির। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান তিনি অসুস্থ। পরের দিন ১৮ জানুয়ারিও তাকে হাজির করা যায়নি অসুস্থতার কারণে। এরপর আদালত ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করেন। কিন্তু ২৪ জানুয়ারিও মধুসূদন ঘরামিকে হাজির করতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
২৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার সকালে চারজন সাক্ষীর নামের তালিকা দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান দুপুর দুইটায় তারা নতুন সাক্ষী হাজির করতে পারবেন। আদালত বলেন চারজনের মধ্য থেকে প্রথম দুজনের যে কোনো একজনকে দুপুর দুইটায় হাজির করতে হবে। কিন্তু দুপুর দুইটায় তারা চারজনের তালিকা থেকে শেষের দুজনের একজনকে হাজির করেন। আদালত এর কারণ জানতে চাইলে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন অন্যরা অসুস্থ।
পরবর্তীতে গত ১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকের উপস্থিতিতে ‘সিক বেডে’ শুয়ে সাক্ষ্য দেন মধুসূদন ঘরামি। এ সময় তার গায়ে কম্বল জড়ানো ছিল। যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অশীতিপর এই বৃদ্ধ, তার বয়স এখন ৮১।
ওইদিন মধুসূদন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, একাত্তরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পরিচিত ছিলেন দেলাওয়ার সিকদার নামে। তিনি বলেন কৃষ্ণ সাহা, ডা. গণেশ আর আমাকে মসজিদে বসিয়ে এই দেলাওয়ার মুসলমান বানায়। তখন আমার নাম রাখে আলী আশরাফ, কৃষ্ণ সাহার নাম হয় আলী আকবর।
ধর্মান্তরিত হয়েও বাঁচতে পারেননি কৃষ্ণ সাহা। কয়েকদিন পর তাকে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী, যে সংগঠন গড়ে উঠেছিল সাঈদীর নেতৃত্বে। মধুসূদন ঘরামি বলেন, তিনি নিজেও ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারেননি। সেদিন অসুস্থ মধুসূদন ঘরামি নিজে কেঁদেছিলেন, কেঁদেছিল উপস্থিত আইনজীবীসহ অন্যরাও।
তবে গত ২ ফেব্রুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারিতেও আদালত সাক্ষীর অভাবে কাজ চালাতে পারেননি। এ দিনের সাক্ষীরাও অসুস্থ ছিল বলে জানায় আইনজীবীরা।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গত ৮ জানুয়ারি সাক্ষ্য দানকারী দশম সাক্ষী বাসুদেব মিস্ত্রি মারা গেছেন। গত ৮ জানুয়ারি সাক্ষী দেয়ার ১৬ দিনের মাথায় মঙ্গলবার তিনি পিরোজপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময়ও তাকে কিছুটা অসুস্থ দেখা গেছে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি আদালত সাক্ষীদের চিকিৎসার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। আদালত স্মরণ করিয়ে দেন, সাক্ষী ছাড়া অপরাধ প্রমাণ করা যাবে না। ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেন, সমস্যা কি, সাক্ষী নাই কেন। সাক্ষী হাজির করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। তখন হেলাল উদ্দিন বলেন, সাক্ষী অসুস্থ।
ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা তো আপনাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, সাক্ষী অসুস্থ থাকলে তাদের চিকিৎসা করাবেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের অপর আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলীকে উদ্দেশ্য করে ট্রাইব্যুনাল সদস্য জহির আহমেদ বলেন, আমরা বিচারক। মামলায় অপরাধীর প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনাদের।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রাক্তন সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এটা ঠিক যে, সাক্ষী সংগ্রহ এবং সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতা আছে। সরকার মনোযোগ দিলে এসব সমস্যা অনেকখানি মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। এই সমস্যা জিইয়ে রেখে সরকার মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের সাক্ষী বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত ভাবনাটা অন্যরকম। সবসময় গ্রাম থেকে সাক্ষী ধরে ধরে আনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এই মামলায় দালিলিক প্রমাণ যেগুলো রয়েছে তা দিয়েই বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব। যদিও ক্ষমতায় থাকাকালীন তারা প্রচুর প্রমাণ নষ্ট করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের বেড়াজালে আটকে আছে। এটা আমি আগেও বহুবার বলেছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কিন্তু প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে করা ঠিক হবে না। এখানে একজন সাক্ষী, একজন অপরাধীর চেয়ে গোষ্ঠীগত বা সমষ্টিগত অপরাধের বিষয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রমাণ করতে হবে একাত্তরে গণহত্যা ঘটেছিল কিনা, জামায়াতে ইসলামী এই হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কিনা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে তারা সহায়তা করেছিল কিনা এবং তারা রাজাকার, আলবদর বা শান্তি কমিটি গঠন করেছিল কিনা কিংবা গঠনে সহায়তা করেছিল কিনা? এগুলো প্রমাণ করাই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার।’
শাহরিয়ার কবির তার বক্তব্যে দ্রুত বিচারকার্য শেষ করার লক্ষ্যে সরকারকে কাজ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘শুধু একটি দুটি ট্রাইব্যুনাল নয়, প্রত্যেক বিভাগের এবং পরে জেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার কাজ শেষ করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বিএনপি ক্ষমতায় এলে ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করে দেবে। তাই ২০১৩ সালের মধ্যে অন্তত কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সময় ৭৩টি ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছিল। এর মধ্যে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীর প্রায় দুই হাজার অপরাধীর বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে যে আইনে বিচার হচ্ছিল তা বাতিল করে দেন। যারা সাজা পেয়েছিল তাদের মুক্তি দিলেন। জামায়াতকে সংবিধান পরিবর্তন করে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিলেন। এবার আর সেই সুযোগ দেয়া যাবে না।’
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, ‘সাক্ষীকে হাজির করতে না পারাটা বড় ব্যর্থতা। এর দায়দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউশন টিমের ওপরই বর্তায়। আমার মনে হয়, এসব সমস্যার মূল কারণ, পুরো বিষয়টিতে সরকার পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি। আমরা অতীতে দেখেছি, তদন্ত সংস্থার প্রধানের অতীত ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথায় তখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তদন্ত সংস্থার প্রধানের নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সেভাবে তদন্তের ভিত্তিতে হয়নি। এরকম আরো অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। আমি আশা করি, সরকার প্রসিকিউশন টিমে আরে লোকজন বাড়াবে। পুরো বিষয়টা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেবে।’

সাক্ষীদের নিরাপত্তা
সাক্ষীদের নিয়ে এত সমস্যা-সঙ্কট তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত সাক্ষীদের বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে আইনের বিষয়ে আলাপ হলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই। অনেকের আশঙ্কা, নিরাপত্তার অভাবের কারণেই সাক্ষীরা অসুস্থতার অজুহাতে আদালতে আসতে চাইছেন না। আদালতে আসলেও কিছু বলতে রাজি হচ্ছেন না তারা একই ভয়ে। পৃথিবীর সব দেশেই এই বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষী নিরাপত্তা আইন রয়েছে।
জানা গেছে, বসনিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় তথ্যপ্রমাণ নষ্ট এবং সাক্ষী গুম করার মতো ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশে এখনও সাক্ষী গুম করার মতো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তাই বলে এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা প্রমাণ হয় গত বছরের শেষ দিকে। সাঈদীর বিরুদ্ধে করা একটি মামলার বাদী পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামের মৃত সৈজদ্দিন পশারীর ছেলে মানিক পশারী ১ ও ২ অক্টোবর নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে থানায় দুটি জিডি করেন। ডায়েরি নম্বর-২৩ ও ৭৬।
১ অক্টোবর করা জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা করায় এবং ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচারকাজ শুরু হলে চিথলিয়া গ্রামের মৃত সত্তার আকনের ছেলে মোস্তফা আকন তাকে মামলা তুলে না নিলে সরকার পরিবর্তনের পর দেখে নেয়ার ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। একদিন পর ২ অক্টোবর করা অন্য জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, পাড়েরহাট বন্দরের মৃত হামেজ মাঝির ছেলে আশরাফ মাঝি, তার ছেলে হাবিবুল্লাহ মাঝি, মৃত রহমান খলিফার ছেলে মাহাবুব খলিফা ও সেকেন্দার আলীর ছেলে রাজা সিকদার তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।
অন্যদিকে ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী চিথলিয়া গ্রামের মৃত মোমেন উদ্দিন পশারীর ছেলে মোখলেছ পশারী তাকে হুমকি দেয়ার অভিযোগে পিরোজপুর থানায় একটি জিডি করেন। এ ছাড়া ৬ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে করা অন্য একটি মামলার বাদী জিয়ানগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুবুল আলম জিয়ানগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলে পাড়েরহাট এলাকার জামায়াত সমর্থক আশরাফ আলী, মুজিবুর রহমান, মাহবুবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সহযোগী ও জামায়াত-শিবির ক্যাডার তাকে এবং মামলার সাক্ষীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি দিচ্ছে।
এত কিছু ঘটলেও এখন পর্যন্ত দেশে সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য কোনো আইন তৈরি হয়নি। যদিও এই বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সরকারকে প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে আসছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারের যথাযথ উদ্যোগই কেবল পারে সাক্ষীদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে এবং এ নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কট প্রশমন করতে।
এ প্রসঙ্গে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সাক্ষীদের নিরাপত্তায় এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে কয়েকটি কামরায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে আদালতও সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন। এ জন্যই গত জুনে আইনের আলোকে বিধিমালা সংশোধন করে এ বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সাক্ষী সুরক্ষা আইনটির খসড়া হয়ে গেছে। খুব দ্রুতই এটিকে পূর্ণাঙ্গ আইন হিসেবে দেখা যাবে।’
অনেক সময় তো ব্যয় হয়ে গেছে। আইন হতে আর কত সময় লাগবে? এমন প্রশ্নের জবাবে আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অন্যান্য সকল পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। চাইলেই আমরা অনেক কিছু করে ফেলতে পারি না। তবে সাক্ষী সুরক্ষা আইনটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হওয়ার ব্যাপার আমি আশাবাদী।’

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: