জাতীয়

তিস্তার পানি না পেলে ট্রানজিট নয়: খালেদা

লালমনিরহাট, ফেব্র“য়ারি ২৭ – তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য ভাগ না পাওয়া গেলে বিএনপি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের ট্রানজিটের বিপক্ষে থাকবে বলে স্পষ্ট করেছেন খালেদা জিয়া।

সোমবার এক জনসভায় তিনি বলেন, “তিস্তা নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। এই সরকার ভারতের কাছ থেকে এক ফোঁটা পানি আনতে পারেনি।”

“তারা [ভারত] তিস্তার পানি না দিলে ট্রানজিট ও করিডোর বন্ধ করে দেওয়া হবে। একতরফা কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে না।”

বিকালে উত্তরাঞ্চলে সীমার্ন্তর্বতী শহর লালমনিরহাটে এ জনসভায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় একটি চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা হয়নি।

তবে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে জানান, ওই নদীর পানি বণ্টনে একটি অন্তবর্তীকালীন চুক্তির উদ্যোগ নেবে ভারত।

বর্তমানে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি আছে যা স্বাক্ষর হয় ১৯৯৬ সালে।

জেলার কালেক্টরেট মাঠে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে এই জনসভা আয়োজন করে বিএনপি। ঢাকায় ১২ মার্চের মহাসমাবেশের আগে এটি খালেদা জিয়ার শেষ প্রচারণা সভা।

ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন খালেদা।

পৌনে এক ঘণ্টার বক্তব্যে দেশের বর্তমান অবস্থা, সরকারের ব্যর্থতা, অপশাসন, দুর্নীতি, পুঁজিবাজার, সীমান্ত হত্যাসহ নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সা¤প্রতিক ভারত সফর, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সাগর-রুনি হত্যা

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারকে দায়ী করে খালেদা জিয়া বলেন, “সাগর-রুনি অনেক গোপনীয় তথ্য ও সরকারের দুর্নীতির কথা জানতেন যা প্রকাশ হলে বিদেশিরা জানতে পারত। তাই তাদের (সাগর-রুনি) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।”

“এজন্যই খুনিরা বাসা থেকে কেবল ল্যাপটপ, মোবাইল ও কম্পিউটার নিয়ে গেছে। অন্য সব জিনিসপত্র ঠিকই আছে।”

বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, “সাগর-রুনির হত্যাকারীকে দেশের বাইরে পার করে দেওয়া হয়েছে। সেজন্য খুনিদের না ধরে সরকার টালবাহানা করছে।”

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি রাজধানীতে নিজেদের বাসায় খুন হন। হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিন পার হলেও পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি।

বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ১২ হাজার নেতা-কর্মী ও ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে খালেদা বলেন, “সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, মানুষের বেড রুমের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের নয়।”

সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উৎঘাটনে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “এই হত্যার রহস্য কী। কেন খুনিরা এখনো ধরা পড়ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বড়াই করে বলেছিলেন, খুনিরা ধরা পড়বে।”

সীমান্ত হত্যা

প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে দাবি করে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জনসভায় বলেন, “সরকার কোনো প্রতিবাদ করছে না। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের নাগরিকরা অন্য দেশের বাহিনীর হাতে হত্যা হবে- এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

“এ জন্য বর্তমান সরকার পরিকল্পিতভাবে বিডিআরকে ধ্বংস করতেই ওই ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এর দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না। একদিন তাকে এজন্য জবাবদিহি করতে হবে।”

সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের প্রতি ইঙ্গিত করে খালেদা বলেন, “এরশাদ এখন বলছেন, ইচ্ছা থাকলে বিডিআর হত্যা বন্ধ করা যেত।”

“তিনি (এরশাদ) এই সরকারের শরিক। তাই তিনিও এর দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না।”

খালেদা অভিযোগ করেন, সরকার দেশকে পরনির্ভরশীল করে ফেলেছে।

“দেশের টেক্সটাইল, স্পিনিং ও ঔষধ শিল্পকে কারসাজি করে তারা বন্ধ করে দিচ্ছে। এরপর ওইসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ভারতীয়রা কিনে নিচ্ছে।”

আগামী নির্বাচন প্রক্রিয়া

আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সরকারকে উদ্দেশ্য করে জনসভায় খালেদা বলেন, “এখনো সময় আছে, হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে নিন।”

“নইলে আন্দোলনেই আপনাদের বিদায় নিতে হবে। তাই কোথায় যাবেন এখনই স্থান ঠিক করে রাখুন।”

গতবছর সাংবিধানিকভাবে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসা বিএনপি গত কিছুদিন ধরে নির্বাচনকালীন ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের’ কথা বলছে।

ঢাকার মহাসমাবেশে লালমনিরহাটবাসীকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা বলেন, “সেদিন ঢাকা মানুষে সয়লাব হয়ে যাবে। আপনারা সবাই ঢাকায় আসবেন।”

“এই সরকারকে হয় দাবি মানতে হবে, না হয় তারা বিদায় নেবেন।”

ঢাকার মহাসমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করব। এতে বাধা দেওয়া হলে দায় সরকারকে নিতে হবে।”

‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া’ এদেশে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না মন্তব্য করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার ভেবেছে, নির্বাচন না হলে তারা ক্ষমতায় থাকবে। এটাও হবে না।”

“অবশ্যই আগামী নির্বাচন হবে নির্দলীয় সরকারেরই অধীনে।”

‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েন থাকতে হবে। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে না,” যোগ করেন খালেদা।

তিনি অভিযোগ করেন, ইভিএম চালু করে বর্তমান ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।

সা¤প্রতিক সময়ে কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনে সীমিত আকারে শুরু করে একটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ইভিএমে সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশন।

চলতি মাসের মাঝামাঝি বিদায় নেওয়া কমিশনের আগ্রহ ছিল আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের।

সরকারের ‘দুর্নীতি’ ও ‘অপশাসন’

পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে সরকার বাজার ধ্বংস করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘লুটপাটের’ কারণে এ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের সিংহভাগ অর্থ যোগান দেওয়ার কথা থাকলেও ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে সংস্থাটি অর্থ ছাড় করেনি। বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনো ওই অভিযোগের সুরাহাও হয়নি। তবে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে এতে ‘দুর্নীতি’ পায়নি।

সারাদেশে বিএনপির কর্মসূচিতে মানুষের সমর্থন দেখে সরকার ‘জন-আতঙ্কে’ ভুগছে বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া।

তিনি বলেন, “কুকুর কামড় দিলে জলাতঙ্ক রোগ হয়। পানি দেখে রোগী ভয় পায়। আজ সরকারের অবস্থাও হয়েছে সেই রূপ। তারা মানুষ দেখে ভয় পাচ্ছে। জন-আতঙ্কে আছে।”

চলতি সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নয়া দিল্লি সফর প্রসঙ্গে খালেদা বলেন, “শুনেছি সীমান্তে মানুষ হত্যার বিষয়ে আশ্বাস নিয়ে এসেছেন। পরে দেখা যাবে সীমান্তে হত্যা হচ্ছে।”

জেলা সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দরটির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।

বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে জনসভা মঞ্চে ওঠেন খালেদা। দুপুর ২টায় জেলা বিএনপি সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়।

এর আগে দুপুর সাড়ে ৩টায় খালেদা জিয়া বগুড়া থেকে সরাসরি সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছান।

সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালিগঞ্জ, হাতিবান্দা ও পাটগ্রাম উপজেলা ছাড়াও কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও রংপুর থেকেও বাস, ট্রাক, ট্রেনে করে নেতা-কর্মীরা জনসভায় যোগ দেয়।

সন্ধ্যা ৭টায় খালেদা জিয়া সার্র্কিট হাউজ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: