অর্থনীতি

হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে মুসলিম বিশ্বের শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের ছয়টি দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের উজ্বল সম্ভাবনা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা, ‘সরকার টু সরকার তথা জি টু জি’ পদ্ধতির মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানির ভ্রান্তনীতি, কূটনৈতিক

তৎপরতার অভাব এবং দ্বিমুখী নীতির ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বিপুল সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনশক্তির জন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মুসলিম বিশ্বের এসব দেশে জনশক্তি রপ্তানীর অর্ডার বা চাহিদাপত্র সংগ্রহ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো ছাড়পত্র প্রদান করছে না। এমনি অবস্থায় এসব দেশ থেকে পাওয়া প্রয়োজনীয় জনশক্তির রপ্তানী সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ভিসা ইস্যুকারি কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবের্ত অন্য কোনো দেশকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পাশাপাশি  ভিসা পাওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি,তাদের পরিবারে একদিকে হতাশা অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে ইরাকে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দেশে জনশক্তি রপ্তানীর অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ সে দেশে বাংলাদেশে শ্রম বাজারের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এমনি অবস্থায় ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট রিক্রটিং এজেন্সির উদ্যোগে মাঝে মধ্যে কিছু ভিসা সংগ্রহ করে দুবাই হয়ে এ দেশে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগ অবিলম্বে ইরাকে জনশক্তি রপ্তানির জন্য দ্বার খুলে দেয়া উচিত বলে মনে করেন এ খাতে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট মহল।

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক তেল সমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে সরকারিভাবে ২০০৮ সালের ৮ মার্চ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সময় সাবেক সেনা প্রধান মঈন উ আহমেদ ভারতে সফরে গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি সে দেশ থেকে ঘোড়া আমদানির কারণে সৌদি সরকার রুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

পরবর্তীতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতা বিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করায় সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেক দফা অবনতি হয়। এখন পর্যন্ত সৌদিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ আরেক দেশ কুয়েত। এখানে প্রায় দু থেকে আড়াই লাখ বাংলাদেশীর জন্য শ্রম বাজারের উজ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও  ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েত সফরে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির আহ্বান জানালে কুয়েত সরকার তাতে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ওই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবে সম্ভাবনময় কুয়েতের শ্রম বাজার এখন অব্দি অবারিত হলোনা।

মুসলিম বিশ্বের আরেক ইমাজিন টাইগার কাতার। কাতারের রাজধানী দোহায় আগামি বছরের নভেম্বরের শেষ নাগাদ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের ১৯৪ দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অংশ নেবেন। আরো অংশ নেবেন সুশীল সমাজ, পরিবেশবাদি, এনজিও কর্মীসহ প্রায় লক্ষাধিক লোক। এ জন্য সে খোনে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চলছে। এসব কাজে বাংলাদেশের দুই থেকে তিন লাখ শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবে এই সম্ভাবনাতে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

একইভাবে আরেক মুসলিম ভ্রাতিপ্রতীম দেশ মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জনশক্তির জন্য উজ্বল কর্মক্ষেত্রে এবং চাহিদাও প্রচুর। সেখানে যাওয়া শ্রমিকদের একাংশ তাদের বেতন ভাতা, থাকা, খাওয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ম্যালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ, অনশন, আন্দোলন  এবং এ নিয়ে মিডিয়ায় নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় স্ব প্রণোদিত হয়ে ২০০৯ সালের  মার্চে মালয়েশিয়া সরকার এ দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানী বন্ধ করে দেয়।

ওই সময় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির জন্য আগের ইস্যু করা ৫৫ হাজার ভিসাও বাতিল ঘোষণা করে মালয়েশিয়া সরকার। এমনি অবস্থায় ঢাকায় সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় গমনেচ্ছু ৫৫ হাজার বাংলাদেশীকে একদিকে আর্থিক ক্ষতি অন্যদিনে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয় তাদের পরিবার পরিজন।

অন্যদিকে, সদ্য যুদ্ধ বন্ধ হওয়া দেশ লিবিয়ায় আগেও বাংলাদেশের শ্রম বাজারের উজ্বল সম্ভাবনা ছিল। সেখানে প্রায় দু’লাখ জনশক্তি কর্মরত ছিল।কিন্তুযুদ্ধের কারণে বিগত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে সে দেশে জনশক্তি রপ্তানী বন্ধ করে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী লিবিয়ার পুনঃগঠন, অবকাঠামো, ভবন, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও উন্নয়নে নতুন করে প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ জনশক্তির চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে সরকার সে দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে অনুমতি দিচ্ছে না। এ পর্যায়ে লিবিয়ায় ব্যক্তি এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শ্রেণী পেশার কয়েক হাজার লোক নেয়ার জন্য ভিসা ইস্যু করলেও বাংলাদেশ সরকার তথা জনশক্তি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এসব ভিসার অনুকুলে ছাড় পত্র দিচ্ছেনা। এমনি অবস্থায় কয়েক হাজার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে।

একদিকে, নিয়োগকারি কর্তৃপক্ষ বার বার সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে চাপ দিচ্ছে দ্রুত এসব ভিসার অনুকূলে লোক পাঠাতে। একই ভাবে ভিসা প্রাপ্ত এসব শ্রমিকরা মালয়েশিয়া যথাসময়ে যেতে না পেরে একদিকে হমতাশা অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতিদে দিশে হারা হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত এসব ভিসার অনুকূলে ছাড়পত্র ইস্যু জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।

এই ব্যবসায় জড়িত একাধিক সূত্র জানায়, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারী মহল চাচ্ছে এ ব্যাপারে এ দেশের সাথে ‘‘সরকার টু সরকার তথা জি টু জি’’ পদ্ধতিতে এ দেশে জনশক্তি রপ্তানি করতে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সেই সব দেশ এখান থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে আগ্রহী নয়। এ কারণেই বাংলাদেশীদের জন্য সম্ভাবনাময় এসব দেশের শ্রম বাজার হাত ছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে জনশক্তি রপ্তানি কারকদের সংগঠন বায়রার সভাপতি আবুল বাসার জানান, সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানির পথ সুগম করতে শ্রমমন্ত্রীর নের্তৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সে দেশ সফর করছেন। আশা করা যাচ্ছে খুব শিগগির একটি ভাল ফল আসবে।

আবুল বাসার জানান, সরকার মুসলিম বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদান এবং সর্বোতভাবে সহযোগিতা দিলে এই সুযোগ কাজে লাগানো অসম্ভব কিছু নয়। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি নজরদারি অব্যাহত রাখা দরকবার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার মুসলিম বিশ্ব নয় পুরো বিশ্বের যেখানে যেখানে বাংলাদেশের শ্রম বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে তা খতিয়ে দেখে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি বন্ধ হওয়া শ্রম বাজার পুনরায় খুলতে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করে বিদেশ লোক পাঠাতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: