খেলা

বিপিএল: আবার ফিক্সিংয়ের কালো ছায়া

ক্রীড়া প্রতিবেদক: বিপিএল শুরুর আগেই আলোচনায় উঠে এসেছিল স্পট ফিক্সিং। মাশরাফি বিন মুর্তজাকে স্পট ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ওই ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। দু-এক দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা পড়বে বোর্ডে। তবে তার আগেই বিপিএল কেঁপে উঠেছে ফিক্সিং-সংক্রান্ত নতুন এক ঘটনায় এবং এটি এতটাই মারাত্মক যে, তা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে মাঠের ক্রিকেটের স্বচ্ছতা নিয়েও!
এবার আর অভিযোগ নয়, ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তারই করা হয়েছে এক পাকিস্তানি নাগরিককে। পরশু চিটাগং কিংস-বরিশাল বার্নার্সের ম্যাচ চলাকালীন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে আটক ওই পাকিস্তানির নাম সাজিদ খান। বিপিএল খেলতে আসা অনেক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আটকের পর বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে সাজিদকে। এরপর তাঁকে সোপর্দ করা হয় মিরপুর থানায়, সেখান থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে। সন্দেহজনক আচরণের জন্য সাজিদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে একটি। কাল আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বলে জানিয়েছেন বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস। কাল সংক্ষিপ্ত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কাছে এসব বিষয় তদন্ত করার মতো লোক নেই। আমরা আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারব না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই এটা পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাই তাদের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে পুলিশ আমাদের কাছে সাহায্য চাইলে আমরা সেটা করব।’
সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে বিপিএলের খেলা চলার সময় থেকেই সাজিদের ওপর চোখ রাখছিল চিটাগং কিংস। গোপনে লোকও লাগানো হয়েছিল তাঁর পেছনে। নজরদারি ছিল বিসিবির নিরাপত্তাকর্মীদেরও। ভিআইপি গ্যালারিতে সাজিদের অবস্থান ছিল বরাবরই ড্রেসিংরুমের আশপাশে। বিপিএল খেলতে আসা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাঁর মাখামাখি ছিল চোখে পড়ার মতো।
পরশু রাজশাহীর ম্যাচ শেষে বিসিবি অফিসের নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় সাজিদকে, দুজনের মধ্যে বিনিময় হয়েছে ফোন নম্বরও। অভ্যর্থনা এলাকা ড্রেসিংরুমের লাগোয়া বলে সেটি ‘জোন-১’ এর আওতায় পড়ে। অনুমোদিত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ছাড়া সেখানে কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। এ রকম সংরক্ষিত এলাকায় সাজিদকে রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলতে দেখে সন্দেহ বেড়ে যায় নিরাপত্তাকর্মীদের।
সবচেয়ে সন্দেহজনক ঘটনাটি ঘটে পরশু সন্ধ্যায় চিটাগং কিংস-বরিশাল বার্নার্স দ্বিতীয় ম্যাচের সময়। চিটাগং কিংসের নাসির জামশেদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন। খেলার ধরন এবং আচার-আচরণের কারণে চিটাগং কিংস কর্তৃপক্ষের সন্দেহ ছিল, জামশেদ বিপিএলে ‘কিছু একটা’ করছেন। এই সন্দেহ থেকেই ওপেনার হলেও সম্ভাব্য স্পট ফিক্সিং ঠেকাতে বরিশালের বিপক্ষে নাসিরকে নামানো হয় চার নম্বরে এবং সেটা আগে থেকে তাঁকে না জানিয়েই। এ নিয়ে ড্রেসিংরুমে বিস্ময় প্রকাশ করেন নাসির। এরপর ডাগ-আউটে বসে উদ্বিগ্ন চেহারায় বারবারই তাকাচ্ছিলেন ভিআইপি গ্যালারির দিকে, যেখানে বসা ছিলেন সাজিদ। একপর্যায়ে সাজিদ তাঁর কাছে অটোগ্রাফ চাইলে জামশেদ গ্যালারির কাছে যান। দুজনের মধ্যে কিছু কথোপকথনও হয়ে থাকতে পারে তখন, এমন সন্দেহ চিটাগং কিংসের।
সন্দেহটা নিরাপত্তাকর্মীদের জানানো হলে ভিআইপি গ্যালারি থেকে ডেকে আনা হয় সাজিদকে। ওই সময় সাজিদের সঙ্গে আরও একজন পাকিস্তানি থাকলেও পরে তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। তবে জব্দ করা হয় সাজিদের মুঠোফোন। সাজিদের মুঠোফোনে নাসির জামশেদের ফোন নম্বর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সূত্র। আছে জামশেদের পাঠানো একটি মুঠোফোন বার্তা, যাতে আছে পাকিস্তানের সিল্ক ব্যাংকের লাহোর শাখায় খোলা তাঁর একটি হিসাব নম্বর। ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের আরেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার রানা নাভেদের ই-মেইল ঠিকানাও মিলেছে সাজিদের ফোনের মেমোরিতে। এ ছাড়া ছিল পাকিস্তানি নম্বর থেকে আসা আরও কয়েকটা খুদেবার্তা। যেখানে সাজিদের ‘পরিশ্রমের’ প্রশংসা করে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, এর সুফল সে পাবে। জিজ্ঞাসাবাদে নাকি নাসির জামশেদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কথাও স্বীকার করেছেন সাজিদ।
তবে সাজিদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিপিএলের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গেম অনের এক কর্মকর্তার আচরণ উপস্থিত অনেককেই বিস্মিত করেছে বলে জানিয়েছে সূত্র। সাজিদ এক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের নাম বললে ওই কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন সেই ক্রিকেটারকে। ফোনে তাঁকে বলেন, ‘তুমি যা জানো বলো। কোনো সমস্যা নেই। আমি ফোনের স্পিকার অন করে রেখেছি। এখানে পুলিশ, বিসিবি কর্মকর্তা সবাই আছেন।’ সবার সামনে মোবাইলের স্পিকার চালু করার তথ্য জানিয়ে কারও কাছে গোপন কিছু জানতে চাইলে সে কি আদৌ কিছু বলবে? নাকি ‘আমি ফোনের স্পিকার অন করে রেখেছি’ কথাটা পাকিস্তানি ওই ক্রিকেটারের জন্য সাবধানবাণীই ছিল! প্রশ্নটা ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনেরই।
ওদিকে নাসির জামশেদকেও কাল জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। জালাল ইউনুসও দিয়েছেন সে রকম আভাস, ‘বিপিএলের দুর্নীতি দমন বিভাগ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে আমি শুনেছি।’

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: