বাংলাদেশ ১৯৭১

বাংলাদেশের বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

রিচার্ড এ মস ও ল্যুক এ নিকটার

রিচার্ড এ মস ও ল্যুক এ নিকটার

ল্যুক এ নিকটার ও রিচার্ড এ মস

ল্যুক এ নিকটার: মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ। টেক্সাসের এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক।
রিচার্ড এ মস: মার্কিন সরকারের পরামর্শক। ২০০৭-২০০৯ পররাষ্ট্র দপ্তরের নিক্সনটেপ বিষয়ক আবাসিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। উভয়ে যুক্তভাবে nixontapes.org সম্পাদনা করছেন। ‘সুপারপাওয়ার রিলেসন্স,ব্যাকচ্যানেলস এন্ড দি সাব কন্টিনেন্ট’ নিবন্ধের অংশবিশেষ লেখকদ্বয়ের অনুমতিক্রমে এখানে ছাপা হলো। মূল নিবন্ধ ২০১০ সালে ‘পাকিস্তানিয়াত’ (ভলিউম-২, সংখ্যা-৩) এ প্রকাশিত।

উত্তর অতলান্তিক সমুদ্রের অ্যাজোর্সে নিক্সন ও কিসিঞ্জার ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ফিরে না আসতেই সংকট গভীরতর হয়েছিল। মিশিগানের অ্যান্ড্রুজে এয়ারফোর্স ওয়ান অবতরণ না করতেই একটি খবর হইচই ফেলে দিয়েছিল—নিক্সন আসন্ন মস্কো শীর্ষ সম্মেলন বাতিল করতে পারেন। এ খবরের সূত্র ছিলেন স্বয়ং কিসিঞ্জার, যিনি বিমানে সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকেরা ভদ্রলোকের চুক্তি লঙ্ঘন করেছিলেন।ওয়াশিংটন পোস্ট জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জারের উদ্ধৃতি দিয়ে পরের দিন সকালে প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে শীর্ষ সম্মেলন-সংক্রান্ত খবর ছেপে দিয়েছিল। পোস্টের প্রতিবেদনটি কার্যত নিক্সন ও কিসিঞ্জারের মনোযোগ ভিন্নমুখী করেছিল, যখন তাঁদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা ছিল পাকিস্তান-ভারত সংকট তথা অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা তথ্য। অ্যান্ডারসন হয়ে উঠেছিলেন শতাব্দীর সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের অন্যতম। তাঁর নাম পরে নিক্সনের বহুল প্রচারিত ‘শত্রু তালিকার’ শীর্ষে পৌঁছায়। নির্দিষ্টভাবে বললে, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে প্রকাশিত অ্যান্ডারসনের সিন্ডিকেটেড কলাম হোয়াইট হাউস অনুসন্ধানকে গতিশীল করেছিল। ওই তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন নিক্সনের অভ্যন্তরীণ নীতি-বিষয়ক সহকারী জন এলিখম্যান এবং হোয়াইট হাউসের কুশীলবেরা। একাত্তরের গোড়ায় পেন্টাগন পেপার্স বেরিয়েছিল, আর তার প্রেক্ষাপটেই ওই তদন্ত হচ্ছিল এবং তা কতিপয় আশঙ্কামূলক খবর দিয়েছিল। ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বরের ওপর ইউম্যান চার্লস র‌্যাফোর্ড (নৌবাহিনীর তরুণ স্টেনোগ্রাফার, তিনি কিসিঞ্জারের দপ্তরে কর্মরত ছিলেন—অনুবাদক) ফাঁস করেছিলেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব ওই দুই দিনে জেসিএস-এনএসসি দপ্তরের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করেছিল। বিশেষ করে কিসিঞ্জার ছিলেন তাদের টার্গেট, আর তিনিই ছিলেন ১৯৭০ সালের নভেম্বর থেকে সোভিয়েতের সঙ্গে গোপন চ্যানেলে যোগাযোগের প্রতিভূ।
১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অচলাবস্থা দেখা দিল। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো সুন্দরবাচনভঙ্গিতে যুক্তি তুলে ধরলেন যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় আগ্রাসনকে আইনি বর্ম দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর ভুট্টো রেগেমেগে অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওই দিনের শেষ ভাগে কিসিঞ্জার এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সোভিয়েত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ইউরি ভারানসোভ মতবিনিময় করলেন। জাতিসংঘের অচলাবস্থা নিয়ে তাঁদের মধ্যে দেখা দিল মতানৈক্য। যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্রিটিশ প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আর সোভিয়েতরা সমর্থন দিয়েছিল পোল্যান্ডের আনা একটি প্রস্তাবে। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর বৈরী ভাব রোধ করায় প্রকৃত গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে এটাও ভাবা হয়েছিল, জাতিসংঘে সংহতি দেখাতে না পারলে সেটা রুশ-মার্কিন সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিক্সনের হোয়াইট হাউস স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট ছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের যৌথ প্রস্তাবে একমত হতে পারছিল না। দুই পরাশক্তি বঙ্গোপসাগরে তাদের নৌশক্তির মহড়া দেখিয়ে বাজি ধরেছিল। সোভিয়েতের সঙ্গে গোপন যোগাযোগে উত্তেজনার পারদ ওপরে উঠছিল, সেখানে তীব্র বিরোধিতার ছাপ ছিল স্পষ্ট।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক হুমকি হয়ে উঠেছিল এই মার্কিন সপ্তম নৌবহর

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক হুমকি হয়ে উঠেছিল এই মার্কিন সপ্তম নৌবহর

১৬ ডিসেম্বর, সকাল। নিক্সন ফোন করলেন কিসিঞ্জারকে। এতে তিনি সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘সোভিয়েতকে ঘরোয়াভাবে চাপ দেওয়ার পরও ভারতীয়রা যদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তাহলে আপনি (কিসিঞ্জার) সোভিয়েতকে জানিয়ে দিন, “তোমরা এমনই অবিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছ যে আমরা কোনো ইস্যুতেই তোমাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারব না। তোমাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের সব সম্পর্কের এখনই ইতি টানা হবে।”’ কিসিঞ্জার এ সময় কিছুটা আশার আলো দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিতে সোভিয়েতরা ভারতীয়দের রাজি করাতে সচেষ্ট হবে। ‘তারা এখনো আমাদের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি এনে দিতে পারে।’ মন্তব্য ছিল কিসিঞ্জারের।
একাত্তরে বাংলাদেশের বিজয়ের শেষ মুহূর্তগুলো যেভাবে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, তা যেভাবে ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ছিল। কিসিঞ্জার-ভারানসোভ বার্তা বিনিময় চলছিল, ভ্লাদিমির মাস্কিয়েভিচের (সোভিয়েত কৃষিমন্ত্রী একাত্তরের ৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন সফরে ছিলেন—অনুবাদক) সঙ্গে বৈঠক হলো, হটলাইন বার্তার আদান-প্রদান চলছিল, হোয়াইট হাউস ও ওয়াশিংটনের সোভিয়েত দূতাবাসের মধ্যে ঘন ঘন টেলিফোন যোগাযোগ চলছিল। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটেছিল। ১৬ ডিসেম্বরের অপরাহ্নে ভারত পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেছিল। পরের দিনই পশ্চিম পাকিস্তানে ভারত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করেছিল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, যুদ্ধবন্দী, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য রাজনৈতিক নিষ্পত্তি মানে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনায় সময় নিয়েছিল কয়েক মাস। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থেকে নিক্সন ও কিসিঞ্জার এই শিক্ষা নিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল, সোভিয়েতের সঙ্গে কঠোরভাবে বোঝাপড়া করা। এর আগে জর্দান সংকটে সোভিয়েতদের মোকাবিলায় যে ঘাটতি ছিল, সেটাও আরেকবার প্রমাণিত হলো।
৪০ বছর পর একাত্তরের সেই সময়ের দলিলপত্রের বিস্তারিত সংগ্রহ, যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত গোপন যোগাযোগের টেপ করা বিবরণ, কিসিঞ্জার-আনাতলি দোবরিনিন (যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত), কিসিঞ্জার-ভরানসোভ বার্তা বিনিময় এবং নিক্সন ও ব্রেজনেভের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার প্রায় পূর্ণ বিবরণ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে নিক্সন প্রশাসন বাংলাদেশ যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এমনকি ভারতীয়দের সংযত করতে সোভিয়েতদের বাধ্য করার দিকেও তারা যাচ্ছিল। যদিও নিক্সন ও কিসিঞ্জার যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁদের তৎপরতার ফলেই সোভিয়েতরা ভারতীয়দের ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছিল, আর সে কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলতে ভারতের হুমকি প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে এই অধ্যায়টির পূর্ণ উপসংহার টানা এখনই সম্ভব নয়। কারণ, এ বিষয়ে ভারতীয় মন্ত্রিসভা, সোভিয়েত পলিট ব্যুরো ও রুশ-ভারত যোগাযোগের কোনো বৃত্তান্তই আমাদের জানা নেই।
সমালোচকেরা একটি বিষয়ে নিশ্চিতভাবে যুক্তি তুলে ধরছেন, আর তা হলো, নিক্সন ও কিসিঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ যুদ্ধে একটি ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়েছিলেন। তাঁদের সহানুভূতি ছিল ইয়াহিয়ার প্রতি। যদিও তাঁদের এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব সম্পূর্ণভাবে মার্কিন নীতিকে যে সংজ্ঞায়িত করেছিল, সেটা দাবি করাও যথার্থ নয়। নিক্সন ও কিসিঞ্জারের আচরণ স্পষ্টতই মনে মনে উপলব্ধি করা চলে এমন জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে একটা যৌক্তিক গণ্ডির মধ্যেই সীমিত ছিল। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের স্বর্ণদ্বার হয়ে উঠেছিল এবং তখন পাকিস্তানের মতো এক মিত্রের প্রতি মার্কিন অঙ্গীকার জাহির করার একটা লক্ষ্যই ছিল চীনাদের মুগ্ধ করা। উপরন্তু পাকিস্তানিদের ওপর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের প্রতি ভারতীয়দের বাস্তব সমর্থনের কারণে হোয়াইট হাউস বিরক্ত হয়েছিল। ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের, বিশেষ করে, গান্ধী ও ইয়াহিয়ার সঙ্গে নিক্সনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁকে নিশ্চিত করেছিল যে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে ‘আগ্রাসন’ চালিয়েছে। আর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টিতে পাকিস্তান সরল বিশ্বাসে সহায়তা দিয়েছে। নিক্সন পাকিস্তানের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন আরও দুটি কারণে। পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের মোতায়েনে তারা রাজি হয়েছিল। আরও রাজি হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার মার্কিনি প্রস্তাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে।
বাংলাদেশ যুদ্ধে নিক্সন ও কিসিঞ্জার একটি আঞ্চলিক বিষয়কে বৈশ্বিক মাত্রা দিয়েছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধের খেলার অংশে পরিণত করেছিলেন। এসবই নিক্সন প্রশাসনের সমালোচকদের শাণিত যুক্তির অংশ। অথচ এটাও সত্য, নিক্সন ও কিসিঞ্জার ভারতীয় এবং পাকিস্তানিদের দ্বারা উপমহাদেশে তাঁদের নিজেদের জাতীয় স্বার্থ মোকাবিলার যে প্রয়াস, তার প্রতি বিস্ময়কর ঔদাসীন্য দেখিয়েছিলেন। যদিও সমালোচকেরা অভিযোগ করেছিলেন, হোয়াইট হাউস এমন কিছু বেপরোয়া পদক্ষেপ নিয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ যুদ্ধকে ঘিরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ এবং অন্যান্য দলিলপত্রের পূর্ণ প্রকাশের মধ্য দিয়ে এখন সেসব অভিযোগের ধার অনেকটাই কমে গেছে। সোভিয়েতদের প্রতি মার্কিন বার্তাগুলোর পর্যালোচনায় এটাই ফুটে উঠেছে যে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল জাতিসংঘে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণে এবং সোভিয়েতকে তাদের বিশেষ মিত্র ভারতকে সংযত করতে উৎসাহিত করা। গোপন যোগাযোগ থেকে এখন আমরা দেখছি, উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বরং নিয়মিতভাবে পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রগতি সাধনে নিক্সন-কিসিঞ্জার সতর্ক ছিলেন। নিক্সন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের যে প্রস্তুতি, সেটা কখনো বাড়ানোর কোনো চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে দেখা যায় না।
বঙ্গোপসাগরে বহুল আলোচিত সপ্তম নৌবহর (টাস্কফোর্স ৭৪) বাহ্যত মানবিক উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে আনার যুক্তি ছিল এক আপাতগ্রাহ্য অজুহাত, কিন্তু প্রকৃত কারণ ছিল ওই এলাকায় সোভিয়েত নৌচলাচলের প্রতি একটা প্রতিক্রিয়া এবং ভারতের প্রতি একটি সংকেত, গোপন যোগাযোগের বার্তাগুলো তা অযৌক্তিক প্রতিপন্ন করেনি।
নিক্সনের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতি কিসিঞ্জারের জন্য একটা আদর্শ সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। সেটা হলো হোয়াইট হাউসে কেন্দ্রীয়ভাবে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। কিসিঞ্জার এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্স ও পররাষ্ট্র দপ্তরকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়েছিলেন। নিক্সন অবশ্য বাংলাদেশ যুদ্ধ ও সংকটকালে পররাষ্ট্র দপ্তরকে পুরোপুরি পাশ কাটাননি; কিন্তু বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে গিয়ে তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরের ভূমিকাকে সীমিত করেছিলেন এবং তাঁদের অজ্ঞাতসারে উদ্বাস্তু সংকট মোকাবিলা করেছিলেন। নিক্সন ও কিসিঞ্জার অবশ্যই বিশ্বাস করতেন, ভারতীয়রা পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরী ভাবকে উসকে দিয়েছিল এবং তাঁদের আরও বিশ্বাস ছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের এমন উদ্দেশ্য রয়েছে, যা সফল করতে দেওয়া হলে মার্কিন স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে আমরা যে এ কথা বলছি, সেটা চূড়ান্তরূপে বলার সময় এখনো আসেনি। সে জন্য আমাদের ভারতীয় দলিল-দস্তাবেজ কবে প্রকাশিত হবে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তবে সবচেয়ে যেটা লক্ষণীয়, সেটা হলো পরাশক্তিগুলো নিজেদের মতো করে যেভাবে বাংলাদেশ যুদ্ধের মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, সেটা কিন্তু ঘটেনি। তাদের ইচ্ছাশক্তি ও পরিকল্পনা হার মেনেছে উপমহাদেশের তৎকালীন বাস্তবতার কাছে। ইন্দিরা গান্ধী, ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমান—চূড়ান্ত বিচারে তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন নিক্সন, কিসিঞ্জার, ভারানসোভ ও ব্রেজনেভের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শেষ উপাখ্যানটির উল্লেখযোগ্য কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন তাঁরাই। নিক্সনের হোয়াইট হাউস সোভিয়েত ইউনিয়নের (এবং জাতিসংঘে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া) সঙ্গে যে গোপন যোগাযোগ গড়ে তুলেছিল, সেটা একটা ত্রিমুখী কূটনীতির জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জাসি হ্যানিমাকি যুক্তি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতি নিক্সন কিসিঞ্জারের ঝুঁকে পড়ার নীতি ছিল আসলে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার নীতির প্রতিফলন। সব পক্ষের নীতিনির্ধারকেরাই যে খেলাটা খেলেছিলেন, সেটার আংশিক ভিত্তি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের বিভাজন রেখা।
অনুবাদ: মিজানুর রহমান খান

 

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

Advertisements

Calendar

February 2012
M T W T F S S
« Jan   Mar »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
272829  
%d bloggers like this: