জেলার খবর

বদনামে সেরা এমপি বদি

কক্সবাজার প্রতিনিধি:

ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী ১৬ আনাই অভিযোগ

অভিযোগের শেষ নেই কক্সবাজারে উখিয়া-টেকনাফ আসন থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, হত্যা, ধর্ষণ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নজিরবিহীন নানা অপকর্মের অভিযোগ এই এমপির বিরুদ্ধে। তার নামে বিভিন্ন সময় খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, সন্ত্রাসসহ নানা অভিযোগে ২৩টি মামলা হয়। তার অপকর্মের বিরোধিতা করলে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। এমপি নিজেই মারধর করেন সরকারি কর্মচারী, স্কুলশিক্ষক, আইনজীবী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটসহ অনেককে। আর এ কারণে এমপি বদির জনপ্রিয়তা এখন শূন্যের কোঠায়। দলীয় নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত মুখর তার সমালোচনায়।

এমপি বদিকে চাঁদা না দেওয়ায় লাঞ্ছনার শিকার হয়ে এলাকা ছেড়েছেন শাহপরীর দ্বীপ রক্ষা বাঁধের ঠিকাদার। আর বাঁধটি নির্মিত না হওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় ১০টি গ্রাম। এ ছাড়া টেকনাফ স্থলবন্দর, মিয়ানমারের চোরাই পণ্য খালাসের ঘাট, দমদমিয়ার বেসরকারি জাহাজঘাট ও সেন্ট মার্টিন ঘাটের টোল আদায় থেকে শুরু করে সর্বত্রই ভাগ বসিয়েছেন এমপি বদি। সেরা দুর্নীতিবাজদের তালিকায়ও নাম উঠেছে তার। তার দাপটে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা। প্রকাশ্যেই দলীয় নেতারা এমপি বদির অনিয়ম-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে একাধিকবার।

জেলা ও উখিয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বলেন, দলের জন্য তো বটেই, দেশের জন্যও এমপি বদি ভয়ঙ্কর। তবে এমপি বদি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সুনাম নষ্ট করার জন্যই একটি মহল তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এইচ কে আনোয়ার বলেন, এমপি বদি মারধর, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও চোরাচালান করে দলকে তছনছ করে ফেলেছেন। টেকনাফ বন্দরকে পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত বন্দরে। তিনি বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের নিয়ে টেকনাফ বন্দর দখল করেছেন। টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, এমপির দাপটে ঐতিহ্যবাহী পর্যটন নগরী টেকনাফ এখন পর্যটকশূন্য। সেন্ট মার্টিনগামী জাহাজগুলোকে তিনি টেকনাফের বদলে দমদমিয়া থেকে চলাচলে বাধ্য করছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টেকনাফ স্থলবন্দর, হাট-বাজার, ঠিকাদারি, পরিবহন, পর্যটকবাহী জাহাজ, টার্মিনাল, জেটিসহ সীমান্ত চোরাচালান ব্যবসা পুরো নিয়ন্ত্রণে নেন এমপি বদি। তার সঙ্গে আছেন ছোট ভাই আবদুল আমিন। এই আবদুল আমিনের পরামর্শেই এমপি বদি কাজ করে থাকেন। আমিন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী। তিনি ইয়াবা ও হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত বলে অধিদফতর জানিয়েছে। অন্য স্বজনদের দখলে বন্দর। এমপির অন্য তিন ভাই মৌলভি মজিদ, আবদুস শুকুর, মো. শফিক বন্দরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। বদির দুই ভগি্নপতি শওকত আলী ও আবদুল গফুর এবং ভাগ্নে নিপু ও ফুপা হায়দার আলীও বন্দরে প্রভাবশালী ব্যক্তি। এমপির চাচা মোজাহের বন্দরের শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করেন। এমপির নিজস্ব বন্দর বলে খ্যাত অবৈধ কাইয়ুকখালী ঘাটের চিংড়ি, কাঠ ও ফলমূল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেন ভগি্নপতি গিয়াস উদ্দীন ও ফুফাতো ভাই সৈয়দ আলম। এমপি বদি প্রভাব খাটিয়ে মিয়ানমার থেকে আনা মালামাল অবৈধভাবে এ ঘাট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ করে দেন, এ বিষয়টি প্রকাশ্য। ‘কেয়ারি সিন্দাবাদ’ নামে একটি মাত্র জাহাজ দমদমিয়া ঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন যাতায়াত করে। এতে যাত্রীপিছু ভাড়া নেওয়া হয় সাড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। অথচ সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারে এক টাকা ২০ পয়সা হিসাবে এই ৩৬ কিলোমিটারের ভাড়া হওয়ার কথা মাত্র ৪৫ টাকা। উপরন্তু পর্যটকদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৫০ টাকা করে বাড়তি ‘কমিশন’ আদায় করে এমপি বদির লোকজন। এদিকে কেউ ‘অবাধ্য’ হলে এমপি বদি নিজেই মারধর করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে। এমন নজির তিনি সৃষ্টি করেছেন বহুবার। এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ২৩ দিন পর টেকনাফ উপজেলা নির্বাচনের দিন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিনকে মারধর করেন বদি। এর পর তার হাতে প্রহৃত হন টেকনাফের বন বিট কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল জলিল ও পুলিন দে প্রহৃত হন এমপি বদির হাতে। টেকনাফের কুলালপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা হাজি মোস্তফা, কক্সবাজারের সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হাকিম, উখিয়ার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলামুর রহমান, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য রাখাল চন্দ্র মিত্র, টেকনাফের সাবরাং হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মুফিজ উদ্দিনও রেহাই পাননি এমপি বদির প্রহার থেকে। গত বছর ১৫ জানুয়ারি কক্সবাজার সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুর রহমানকে ধরে এমপি বদি বেধড়ক পিটুনি দেন। একই বছর ৩ জুলাই তিনি টেকনাফের শামলাপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর আলমকে (৫২) প্রকাশ্যে পিটিয়ে নাস্তানাবুদ করেন। মঞ্জুর আলমকে উদ্ধার করতে গিয়ে বদির হাতে নাজেহাল হন শামলাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল্লাহ।

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: