মুক্তমত

একটি ভাষণের বিনির্মাণ : নির্দেশ থেকে দেশ

khondokar-bhai

খোন্দকার আশরাফ হোসেন: কবি, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

যে-কোনো জনগোষ্ঠিই স্বয়ংক্রিয় স্বাভাবিকতায় জাতি হিসেবে পরিগণিত হয় না। লক্ষ-লক্ষ কিংবা কোটি-কোটি মানুষের সমাহারই অবলীলায় জাতি গড়ে তোলে না। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসীমার মধ্যে পরম্পরাক্রমে যারা বসবাসরত, একইরকম সামাজিক-রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আত্মিক-মানসিক সংহতির প্রেষণায় যারা যূথবদ্ধ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ একই সূত্রে গ্রন্থিমান দেখার মানসসংগঠন যাদের মধ্যে সঞ্জাত ও ক্রমবিকশিত, তারাই সম্ভবত একসময় জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জাতি সংগঠনের নানাবিধ প্রক্রিয়ার বিশদ বিশ্লেষণ করে থাকেন, তবে যে-বস্তুটি একক সাধারণ গুণনীয়কের মতো বিরাজমান থাকে তা হলো জাতির যৌথ নির্জ্ঞানের মধ্যে আলাদা, স্বয়ম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তথা স্বাধীন হওয়ার অভিকাঙ্ক্ষা। এই অভিকাঙ্ক্ষাটি ফলের অভ্যন্তরের বীজের মতো গুপ্ত থাকে, ক্রমপরিণতি পায় এবং ইতিহাস-ভূগোল-সমাজবাস্তবতার ত্রয়ীপিস্টনে ঘূর্ণ্যমান হয়ে একসময় রূপ নেয় জাতীয়তাবাদের।  জাতির এক ক্রান্তিমুহূর্তে, যেনবা দৈববশেই, আবির্ভাব ঘটে এক কিংবা একাধিক জননায়কের, যিনি বা যাঁরা জাতির স্বাধীনতার অভিকাঙ্ক্ষাকে সংহত ও শাণিত বর্শামুখ করে তোলেন, এবং সকল বিরুদ্ধতা ও বৈরিতার বিপরীতে চালিত করেন। একটি জাতির জীবনে স্বাধীনতার অভিলাষটি ক্রমেই কল্পস্বর্গীয় আশাবাদ থেকে নেমে আসে বাস্তবসংগ্রামের রূঢ়-কঠিন মাটিতে। দীর্ঘ সংগ্রাম চলতে শুরু করে অতঃপর, এবং একসময় কোনো এক যুগনায়ক আবির্ভূত হন, যিনি টালমাটাল জনসমুদ্রের সামনে উদ্ধত বর্শাফলক হাতে ঘোড়সওয়ারের মতো নেতৃত্ব দেন। কবি বিষ্ণু দে-র এই পঙক্তিগুলো কি আভাস দিয়েছিল তেমনি কোনো এক ঘোড়সওয়ারের আবির্ভাবের, বাঙালি জাতির মধ্যে :

জনসমুদ্রে জেগেছে জোয়ার ,
হৃদয়ে আমার চড়া।
চোরাবালি আমি দূরদিগন্তে ডাকি
কোথায় ঘোড়সওয়ার ?
……..
হালকা হাওয়ায় বল্লম উঁচু ধরো।
সাতসমুদ্র চৌদ্দনদীর পার
হালকা হাওয়ায় হৃদয় দুহাতে ভরো,
হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার।


বাঙালি জাতির ইতিহাসের তত্ত্বতালাশ যাঁরা করেছেন সেইসব ইতিহাসবিদ মোটামুটি একমত যে প্রায় হাজার খানেক বছর আগে এই জাতিগোষ্ঠির আত্মপরিচয় দানা বাঁধতে শুরু করে, মূলত জায়মান বাংলা ভাষা এবং তদ্ধৃত সাহিত্যকে কেন্দ্র করে। এর আগেও এই ভূখণ্ডে নিশ্চয়ই জনবসতি ছিল, কিন্তু তাদের আত্মপরিচয়ের সীমা-সরহদ্দ তখনকার অধিবাসীদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। সংস্কৃত-প্রাকৃত-অবহঠ্ঠ-র হট্টরোলের মধ্য থেকে যখন আদি বাংলা ভাষার স্বরূপটি দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, তখনই সূত্রপাত হয়েছিল এই ভাষিক জনজাতির। চর্যাপদের কূটাভাসী গীতবিতানের মধ্যে আদি বাঙালির জীবন ও জগৎভাবনা, তার সমাজ-অর্থনীতির ইঙ্গিত থেকে গেল। সন্ধাভাষার আলো-আঁধারির মধ্যেও অস্পষ্ট থাকল না বাঙালি যে নিরন্নতা ও দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করেছে সেই কালেও, একালের মতো : গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছ সম্ভবত তার ইচ্ছাপূরণের কল্পগল্পমাত্র :

টালত ঘর মোর নাহি পরবেষী
হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী

বাঙালির বাঙালি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং বাঙালিচেতনার প্রগ্রসরণ নিয়ে ইতিহাস ফাঁদার অবকাশ এবং প্রয়োজন কোনাটাই এখানে নেই। হাজার বছরের পুরনো বাঙালি জাতিসত্তাটি যে ক্রমে জাতীয়তাবাদের পরিণতির দিকে অগ্রসরমান হলো এবং একসময় অনিবার্যভাবে জাতিরাষ্ট্রের আকাঙক্ষী হয়ে উঠল সেই ঘটনাটি শুধু আমরা সাগ্রহ লক্ষ করবো। উপনিবেশী কালের ঘটনাক্রমও আমাদের জানা; আমরা এ-ও জানি কী করে বৃটিশ শাসকদের বিভেদপন্থী নীতি কিয়ৎকালের জন্য আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল বাঙালির চেতনাকে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের বিপরীতমুখী এক টান। পাকিস্তান নামক এক অদ্ভূত রাষ্ট্রের ভেতরে এই ভূখণ্ডের মানুষেরা নিজেদের বিলীন করে দিয়েছিল সানন্দে কুয়াশায় আত্মপরিচয় আমরা বিস্মৃত হয়েছিলাম। কিন্তু সেই ঘোর থেকে জাগিয়ে দিয়েছিল একটি ঘটনা, এবং তাৎপর্যপূর্ণ, সেটি ভাষাকে ঘিরেই। বাঙালি সব ছেড়ে, সব স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানী হয়েছিল, কিন্তু যখন তার প্রাণভোমরাকে ধরে টান দিল পশ্চিমী বিভাষী শাসকরা, তখন তারা তা সহ্য করলো না। আহত বিত জাতিসত্তা জেগে উঠল নিদ্রা ভেঙে, দাবি জানালো বাংলাভাষার অধিকারের, মূলত বাঙালি জাতিসত্তার স্বতন্ত্রতার। বাঙলাভাষাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতির যে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রয়োজন সেটি উপলব্ধ হলো। এই সেই ক্রান্তিলগ্ন, ইতিহাসের এক নাভিকেন্দ্র যেখান থেকে কহারের মতো জেগে উঠলো ভবিষ্যতের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভিকাঙ্ক্ষাটি। ইতিহাস ইতোমধ্যে তার নায়ককে খুঁজে নিচ্ছে হাজারো মুখের ভিড় থেকে; জনসমুদ্রের জোয়ার উঠবে অচিরকালের মধ্যে, সেই জোয়ারের অগ্রভাগে তীব্র-তীক্ষ্ণ জাতীয় চেতনার বর্শা হাতে এগিয়ে যাবেন একজন মহানায়ক। ইতিহাসের একটি স্বতঃনির্বাচনী প্রক্রিয়া রয়েছে, যেই প্রক্রিয়ায় ধীরে-ধীরে পশ্চাৎবর্তী হতে থাকলেন বেশ কিছু দেশপ্রেমী মেধাবী নেতাও, কারণ চূড়ান্ত পরীক্ষায়, ধৈর্যে, সাহসে, একাগ্রতায় ও মরণপণ প্রতিজ্ঞায় দুর্মর হয়ে উঠছেন তখন একজন মহানায়ক, বামন নেতাদের মধ্যে দীর্ঘাঙ্গী এক পুরুষ, বজ্র যার কণ্ঠস্বরে, যার চোখে শুধু স্বদেশের মুক্তির চিত্র, হৃদয়ে যার স্বদেশের জন্য অপার ভালবাসা। ইতিহাস মুজিবকে গড়েছে ধীরে ধীরে নিজ হাতে; এবার তিনিই নিজ হাতে গড়বেন ইতিহাস । ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লমানুষের উপস্থিতে তিনি যে-ভাষণটি দিলেন তাই চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দিল বাঙালির ইতিহাসকে যেমন, তেমনি একটি অয় সিলমোহর দেগে দিল একটি নামের ওপর,  শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ইতিহাসের সন্তান ও জনক একই সাথে; তিনি যুগপৎ ইতিহাসকে ভাঙলেন এক হাতে, অন্যহাতে গড়লেন এক নবতর ভবিষ্যতের ইতিহাস। যখন তিনি ঘোষণা করলেন, `এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম`, তখন একদিকে সমাপ্তি ঘোষণা করলেন এযাবতকালের চলমান রক্তপাত, বঞ্চনা, দীর্ঘশ্বাস ও শোষণের ইতিহাসের, এবং যবনিকা ওঠালেন নতুনতর ইতিহাস-নির্মাণের। ১৯৪৮, ৫২, ৬২, ৬৯-এর সংগ্রামগুলো ছিল যেন খণ্ডিত, তাৎক্ষণিক, সীমিত লক্ষ্যের আন্দোলন; এবার শুরু হচ্ছে যথার্থ সংগ্রাম, যার লক্ষ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা তো বটেই, তারও চেয়ে বেশি বাঙালির সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক মুক্তির সংগ্রাম। সাতই মার্চের ময়দানের বঙ্গবন্ধুর উত্তোলিত তর্জনী দিগন্তের দিকে প্রসারিত, যে-পূর্ব দিগন্তে অচিরেই সূর্য উঠবে রক্তলাল, এবং অশ্র“ ও গন্ধকের নদী আর রক্তের সমুদ্র পায়ে হেঁটে পার হবে বাঙালি জাতি। সাতই মার্চের ভাষণদানরত বঙ্গবন্ধুকে আমার কবিমানসে মনে হয় একজন মোজেসের মতো, যার হাতে ঐ লোহিতদরিয়ার পরপারের সবুজনিসর্গস্পন্দিত, শষ্যদোলায়িত ক্ষুধামুক্ত প্রতিশ্র“ত এক স্বদেশের নকশা। তিনি সে-মুহূর্তে তাঁর সমকাল ও পরিপার্শ্বকেও ছাপিয়ে উঠে যান দেবদ্রোহী প্রমিথিয়ুসের মতো।

ইতিহাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গড়ে তুলেছে বাঙালি জাতির নানা পটপরিবর্তন, উত্থান উন্মন্থনের ভেতর দিয়ে। ১৯৪৭-এ যে যখন ভারত বিভক্ত হলো, তখন তিনি তরুণ ছাত্রনেতা। দেশভাগের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও নতুন একটি ভূখণ্ড অর্থাৎ পাকিস্তানের সৃষ্টি এ অঞ্চলের মানুষের মনে যে আশাবাদ ও উদ্দীপনার জোয়ার এনেছিল তিনি ছিলেন তার অংশীদার। কিন্তু অচিরকালের মধ্যে আশাভঙ্গের বেদনা ও হতাশ্বাস যখন গ্রাস করতে থাকলো মানুষের মন, প্রধানত বাংলাভাষার স্থলে ভিন্নভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার যে ষড়যন্ত্র, তার বিরুদ্ধে ধূমায়িত বিক্ষোভ এবং জায়মান প্রতিবাদ বঙ্গবন্ধুকে ভেতর থেকে পাল্টে দিয়েছিল প্রায় রাতারাতি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, উপনিবেশবাদের এক অজগর সাগরপারে প্রত্যাবৃত্ত হলেও আরেক সূতাশঙ্খিনী বাংলার লোহার বাসরঘরে প্রবেশ করেছে। ৪৮-এর প্রথম ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাহান্নর ফেব্র“য়ারির মধ্যেই মুজিবের ভবিষ্যৎ রাজনীতির মানসচিত্র অঙ্কিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে বাঙালিরা নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় স্থিত হতে পারেনি। এইসব সংক্ষোভ জমা ছিল বঙ্গবন্ধুর মনে। সাতই মার্চের ভাষণে আমরা ল’ করবো তিনি সেই প্রবঞ্চনার কথা বলছেন দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে। ১৯৫৪-এর প্রবঞ্চনাকে সংযুক্ত করছেন ৭১-এর বঞ্চনার সাথে। উচ্চারণ করছেন বেদনাদীর্ণ একটি প্রশ্ন : `কী অন্যায় করেছিলাম?` ঐ দুই সময়প্রান্তের মাঝখানে আরো অনেক রক্তপাত, শোষণ আর প্রতারণার ইতিহাসকে তিনি গ্রথিত করলেন একসূত্রে:

…আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস, মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সনে রক্ত দিয়েছি, ১৯৫৪ সনে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সনে আয়ুব খান মার্শাল ল` জারি করে দশ বৎসর পর্যন্ত আমাদর গোলাম করে রেখেছিল। ১৯৬৬ সনে ৬ দফার আন্দোলনে, ৭ই জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

এরপরই তিনি চলে এলেন বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে। সত্তরের নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, এবং তিনি নির্বাচিত হলেন মেজরিটি পার্টির নেতা। তিনি ইয়াহিয়া খানকে অনুরোধ করলেন ১৫ই ফেব্র“য়ারি এসেম্বলির অধিবেশন দিতে, কিন্তু `তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।` এসেম্বলির অধিবেশন পিছিয়ে দেয়া হলো, আর অন্তরালে চলতে থাকলো ষড়যন্ত্রের খেলা। জননায়ক ভাষণের শুরুতেই অবশ্য জনগণকে আস্থায় নিয়ে নিয়েছেন এই কথা বলে `আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।` তাঁর আস্থাভাজন জনতাকে তিনি বর্তমান সংকটের স্বরূপটি বোঝালেন সংক্ষেপে, কিন্তু খুব প্রাঞ্জলভাবে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে এসেম্বলির নির্ধারিত তারিখ তিনি মেনে নিয়েছিলেন, প্রস্তুত ছিলেন সবার সাথে আলোচনা করে পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র তৈয়ার করার জন্য। বললেন, কী করে ভুট্টো সাহেবের গোয়ার্তুমিতে ভেস্তে গেল সব। পরিষদের অধিবেশনের তারিখ বাতিল করা হলো এবং দোষ দেয়া হলো বাংলার মানুষকে; বললেন কীভাবে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল, কীভাবে নেতার নির্দেশে পালিত হলো হরতাল, শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন।

ভাষণের এই পর্যায়ে দেখি বঙ্গবন্ধু আবার আরেকটি বেদনার্ত প্রশ্ন উচ্চারণ করছেন, তাঁর কণ্ঠে হাহাকার করে উঠছে বাংলার নদী-ঘাট-মাঠ, বঞ্চিত মানুষের পাঁজরা ও কপাল : ` কী পেলাম আমরা?  যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী আর্ত মানুষের মধ্যে। তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি।` আবার ইতিহাসের পুনশ্চারণ গভীর বেদনার সাথে; আয়রনিসঞ্জাত পরিস্থিতির কারুণ্য তখন ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে আহত জাতিসত্তার হৃৎপিণ্ড থেকে: `আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা বাঙালিরা যখনই মতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে।`

এভাবে ক্রমাগত ইতিহাসের সামনে ও পেছনে যাচ্ছেন মুজিব। সবিস্ময়ে লক্ষ করি ভাষণটি যেন একটি নাটকের ক্ল্যাসিকাল সংহতি তার অবয়বে ধারণ করছে। ভাষণের শুরু গভীর বেদনাবোধ দিয়ে, শেষ ইতিহাসের এক অনুমিত ট্রাজিক উল্লাসের ভেতর, যেখানে বাংলার জয় সূচিত হবে, কেননা, তাঁর বলদৃপ্ত অনুভাবনা ও ভবিষ্যদৃষ্টি : ` রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।` বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের নানারকম বিশ্লেষণ সম্ভব। ইতোমধ্যে কেউ কেউ তা করেছেনও।  বহুমাত্রিক এই ভাষণটি যেমন কাব্যিক ছন্দোময়তায় গঠিত, তেমনি বেদনা, আক্ষেপ, অহংকার, হুংকার, নির্দেশ, স্বপ্ন, বাস্তব পরিকল্পনা এবং নাটকীয় নানা তরঙ্গবিভঙ্গে উচ্চকিত। করুণ রসের সাথে বীর রস, অতীত থেকে নিমেষে বর্তমানে আসা, আবার ভবিষ্যতের রূপরেখা অঙ্কন করা, হতাশা-বেদনা-আশা-স্বপ্নএবং আশংকা — নানা বিবাদী-সংবাদী স্বরের এক অর্কেস্ট্রা গড়ে উঠে তেরো মিনিটের এই ভাষণে। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তের রূপকার তিনি; তিনিই এর পশ্চাৎপটনির্মাতা, নাট্যকার, সংলাপরচয়িতা ও অভিনেতা। বাঙালির হাজার বছরের জাতিরাষ্ট্রের আকাঙক্ষাকে তিনি সূচীমুখ করে ছুড়ে দিলেন বিশ্বজনের কানে: মুক্তির ও স্বাধীনতার চরম মুহূর্তের ঘণ্টাটি তিনি বাজিয়ে দিলেন এক অলৌকিক মুহূর্তে। চিরকালের জন্য ফ্রিজ হয়ে গেল তাঁর উত্তোলিত তর্জনী। ইতিহসের সেই মুহূর্তটিকেই আজ আমরা এখানে পুনরুদ্‌যাপন করছি অমিত গৌরবে আর গভীর ভালোবাসায়।


বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা সম্ভব, কীভাবে লোকভাষার প্রাত্যহিক উচ্চারণভঙ্গি সহজ স্বাভাবিকতায় জনসমুদ্রের শ্রোতার হৃদয়ে সঞ্জনিত ও মর্মরিত হলো, কীভাবে বাংলার লোকজীবনের মরমিয়া রসে সিক্ত ভাষার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির আশার ভাষা ইনশাল্লাহ পর্যন্ত অবলীলায় উচ্চারিত হলো, এ সবই গভীর অভিনিবেশের সাথে বিশ্লেষণ করা চলে। বিশিষ্ট লোকতত্ত্ববিদ এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিশ্লেষক জনাব শামসুজ্জামান খান ৭ই মার্চের ভাষণের ভাষাগত ব্যাঞ্জনা ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন :
` বাংলাদেশের মানুষের একটা স্বকীয় সত্তা ও নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে। লৌকিক ভাষাভঙ্গি ও বাকপ্রতিমায় তার চমৎকার ও লাগসই প্রকাশ ঘটে। এই বিশিষ্ট সত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য চারিত্রিক দার্ঢ্য, বিদ্রোহের মানসিকতা এবং কোনো অবস্থাতেই মাথা নত না করা। বাংলার পৌরাণিক চরিত্র চাঁদ সওদাগর, সাহিত্যের চরিত্র হানিফ গাজী ও তোরাপ, কাব্যস্রষ্টা কবি নজরুল এবং মানবিক ও রাজনৈতিক চরিত্র শেখ মুজিবে আমরা এই বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় পাই। বাঙালি চরিত্রের এই বিশিষ্ট রূপের স্পর্শে ৭ই মার্চের ভাষণে যুক্ত হয়েছে অনন্য বৈভব। বঙ্গবন্ধু তাঁর আপোসহীনতা ও চারিত্রিক দার্ঢ্যরে পরিচয় মুদ্রিত করেছেন  লৌকিক বাগভঙ্গির বিশিষ্ট বুলির সংযোজনের মাধ্যমে। প্রাকৃতজনের ব্যবহৃত এইসব মণিমুক্তাসদৃশ শব্দ বাঙালির ব্যবহারিক জীবন থেকে নেয়া। ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর শিকড়সম্পৃক্ত বুলিসমৃদ্ধ এরকম একটি লাইন হল : ` সাড়ে সাতকোটি মানুষেরে দাবায়ে রাখতে পারবা না।`
আমার নিজের ধারণা, সম্পূর্ণ ভাষণটিতেই পাওয়া যাবে লোকজ ভাষাভঙ্গির ছোঁয়া, যা বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের লোকজীবনসম্পৃক্তি এবং তৃণমূল মানুষের মুখের ও মনের ভাষা বোঝবার মতা থেকে সঞ্জাত। ভাষণটি যে পূর্বলিখিত নয়, এমনকি তাঁর হাতেও কোন নোটসম্বলিত চিরকুট ধৃত দেখি না, অথচ অবলীলায়, ধীরোদাত্ত স্বরপেণে তিনি উচ্চারণ করে গেলেন তাঁর ক্ষোভ-বিক্ষোভ, আদেশ-নির্দেশনা, এবং সেই মুহূর্তে সমগ্র জাতি কান পেতে রয়েছিল যা শোনার সেই স্বাধীনতা-যুদ্ধের ইঙ্গিতপূর্ণ ঘোষণা। `শহীদের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আর টি সি-তে মুজিবুর রহমান যোগ দিতে পারে না`, `আমি পরিস্কার অরে বলে দেবার চাই, আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবেনা`, ` তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল`, `আমি যদি যদি হুকুম দেবার না পারি` ইত্যাকার উচ্চারণগুলির গ্রামীণ ও লোকজ প্রকাশভঙ্গি লক্ষণীয়। প্রমিত বাংলা ব্যাকরণের শব্দবিষয়ক আচার ও ক্রিয়ারূপের ছুঁৎমার্গ উড়ে যায় প্রবল আবেগ আর ঐকান্তিকতার ফুৎকারে, এবং সেই মুহূর্তে পূর্ববাংলার মানুষের মুখের বুলির ভবিষ্যৎ স্বীকৃতিরও একটি মুক্তিসনদ যেন রচিত হয়ে যায়। এই বিষয়টি নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে অচিরেই একটি বিতর্ক ও আলোড়ন তৈরি হবে বলে ধারণা করি, যে, বাংলাদেশের বাংলাভাষাটি তৎসমায়নের চিরাচরিত ও স্বীকৃত পথ ছেড়ে তদ্ভবায়নে তথা লৌকিকায়নের পথে কতদূর যাবে। এ বিষয়ে আলোচনার উপযুক্ত স্থান ও পরিবেশ এটি নয়, তবে, বাংলাদেশের মানুষের অবলম্বিত বাংলাভাষার একটি স্বতন্ত্র, অন্তত স্বাতন্ত্র্য-অভিসারী ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক আদর্শ গড়ে উঠেছে কিনা গত পঞ্চাশ বছরে, সেটি নিয়ে একটি আলোচনার পরিসর ক্রমেই সৃষ্টি হচ্ছে। অনাগত সেই আলোচনার দিনে বঙ্গবন্ধুর লোকজবানমিশ্রিত ভাষণটি একধরনের দিশারী হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আমার ধারণা।

সাতই মার্চের ভাষণের স্পষ্ট দুটো ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগটিতে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করছেন এবং বর্তমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করছেন। তিনি ইয়াহিয়া-আহূত রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যাবেন না, কেননা `আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপরে গুলি করা হয়েছে… আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে।` এই সূত্রে তাঁর ব্যথাদীর্ণ প্রশ্ন : `কিসের আর টি সি, কার সঙ্গে বসব? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের  সংগে বসব ? `
দ্বিতীয় ভাগটি শুরু হচ্ছে `ভাইয়েরা আমার` সম্বোধনের পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে। এই পর্বে বঙ্গবন্ধু শাসকদের জন্য দিচ্ছেন কিছু শর্ত, এবং জাতির জন্য তাঁর সুচিন্তিত নির্দেশনা। শর্তগুলো যথাযথ এবং দৃঢ়তাপূর্ণ যদিও তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন সেগুলি মান্য হবে না, এবং বাঙালিদের শেষপর্যন্ত শত্র“র মোকাবিলা করতে হবে প্রতিরোধ প্রস্তুতির মাধ্যমে। শর্তগুলো স্মরণ করা যাক :

১. `সামরিক আইন মার্শাল ল উইথড্র করতে হবে।`
২. ` সামরিক বাহিনীর লোকদের ফেরৎ নিতে হবে।`
৩. ` যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে।`
৪. ` জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে মতা হ¯আন্তর করতে হবে।`

এবং তারপরেই তার দৃপ্ত ঘোষণা, `আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমি এদেশের মানুষের অধিকার চাই।`
এ পর্যায়ে আমরা উপনীত হই ভাষণের সবচেয়ে দিকনির্দেশনামূলক ও বৈপ্লবিক অংশে। আসে কয়েকটি নির্দেশ এবং সবশেষে একটি স্মারকসম্বলিত সঙ্কল্প ।

নির্দেশগুলো এরূপ:
১. `আমি পরিষ্কার অরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। ….২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।`
২. `আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে।`
৩. `জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।`
৪. `আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে……. যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন।`
৫.  `সরকারি কর্মচারীদের বলি: আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত এই আমার দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হল। কেউ দেবে না।`
৬. `এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান বাঙালি নন-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।`
৭. `যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয় কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না।`
৮. `দুই ঘন্টা ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নেবার পারে।`
৯. `যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে শুনে কাজ করবেন।`
১০. `প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।‌`
১১. `মনে রাখবা : রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।`
ভাষণের শেষ পঙক্তিটিই সেই তীব্র-তীক্ষ্ণ বর্শাফলক, ক্রমস্ফুটমান নাটকের ক্লাইমেক্স, এতক্ষণ ধরে তিনি যেসব নির্দেশনা দিচ্ছিলেন তার লক্ষ্যবিন্দু এবং সারাৎসার : `এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।`  দুই পঙক্তির এই অজর কবিতা ও অবিনাশী গান যেন বিষ্ণু দে-র কবিতার সেই `সংহত গ্লেসিয়ার`।

সামান্য আবেগের অতিরেক, একটি শব্দের স্থানচ্যুতি কিংবা সামান্যতম অতিশায়নে ভেঙে চুরমার হয়ে যেত গ্লেসিয়ার এবং অনিরুদ্ধ প্রবল জনরোষের সৃষ্টি করতে পারত যাতে ঘোড়সওয়ারের হাতের লাগামটি হয়ে যেত ছিন্ন। যে-জনতার জোয়ারকে তিনি নেতৃত্বের প্রখর লাগাম ধরে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, ঐ মুহূর্তে তা স্খলিত হলে ভেস্তে যেত সব। শত্র“ তখন আক্রমণের সুযোগ সন্ধানী; সামান্যতম উস্কানিতে তারা ঝাপিয়ে পড়ত নিরস্ত্র জনতার ওপর; পুনরাভিনীত হত কয়েক সহস্র জালিয়ানওয়ালাবাগ। বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই শিরা ও শোণিতের, অগ্নি ও তুষারের এক অবিশ্বাস্য সমীকরণের মহড়া দিয়ে রেখেছিলেন মনে মনে; না হলে জনসমুদ্রের স্বাধীনতার উদ্বেল আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য পশ্চাতে দণ্ডায়মান ছাত্রনেতাদের প্রবল চাপ, অন্যদিকে একপাকি স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত বিপদের সম্ভাবনা এবং সর্বোপরি ইতিহাসের তুঙ্গতম মুহূর্তে পৌঁছার হিরন্ময় সুযোগের হাতছানি, সবকিছুর মধ্যে একটি ফাইন ব্যালেন্স তিনি যেভাবে ঘটালেন তা এককথায় বিস্মিত ও শিহরিত হওয়ার মতো ঘটনা। তিনি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করে শত্র“কে সুযোগ দিলেন না, আবার একই সাথে যা করলেন তা স্বাধীনতা ঘোষণারই অন্য নাম। যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ আসলে সশস্ত্র হওয়ার নির্দেশ, প্রাণপণ প্রতিরোধ ও সম্ভাব্য রক্তবন্যার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তির তীরে পৌঁছানোর নির্দেশ। এই নির্দেশ সফলভাবে পালন করেই বাঙালি অর্জন করতে পেরেছে দেশ।` `নির্দেশ` কথাটির একটি অর্থ হতে পারে দেশহীনতাও : সেই অর্থে নির্দেশ থেকে দেশে উত্তরণের যে পথ তারই মানচিত্র ও দিগদর্শন ৭ই মার্চের ভাষণ।
সবাইকে ধন্যবাদ। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

 (৩ মার্চ ২০১২, ঢাকার ওসমানী মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিষয়ক সেমিনারে পঠিত মূল প্রবন্ধ)

 

Advertisements

About EUROBDNEWS.COM

Popular Online Newspaper

Discussion

Comments are closed.

%d bloggers like this: